অফিসের লিফটে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ করে স্টিলের দরজায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে চমকে উঠলাম। এ কে? এই ক্লান্ত চোখ, এই ঝুলে পড়া কাঁধ – এ তো আমি নই। আমি তো হায়দার, যে স্বপ্ন দেখত, যে ভাবত জীবনটা অন্যরকম হবে।
আজ আবার চাকরিটা হারালাম। তিন মাসের। বসের সামনে দাঁড়িয়ে যখন শুনলাম “আপনার আর প্রয়োজন নেই”, তখন ভিতরে কিছু একটা ভেঙে গেল। কিন্তু কান্না এল না। শুধু মনে হল – এই তো আমার পরিচয়? এই অফিস, এই চেয়ার, এই ফাইল? এই কার্ডে লেখা “এক্সিকিউটিভ অফিসার” – এটাই কি আমি?
বাড়ি ফিরে হ্যাপির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি, সে জানে। কিছু বলার আগেই সে আমার কাঁধে হাত রাখল। “আবার হয়েছে?” শুধু মাথা নাড়লাম। আরাশ বারান্দায় বসে রাস্তার মানুষ দেখছে। ওর কাছে যেতেই বলল, “বাবা, ওই লোকটা কে?” ইশারা করল একজন ফেরিওয়ালার দিকে।
“ফেরিওয়ালা।”
“না বাবা, ও একজন মানুষ। ওর নামটা কী? বাড়িতে কে কে আছে? ও কী স্বপ্ন দেখে?”
আরাশের প্রশ্নে থমকে গেলাম। ঠিক তো। ও শুধু ফেরিওয়ালা নয়। আমিও শুধু “অফিস কর্মচারী” নই। কিন্তু তাহলে আমি কে?
রাতে শুয়ে ভাবলাম। বাবা যখন মারা গেলেন, আমার তেইশ। তখন মনে হয়েছিল পৃথিবীর সব দায়িত্ব আমার কাঁধে। কিন্তু দায়িত্ব তো পেশা নয়। মা যখন বলতেন “তুই আমার ভরসা”, সেটা কোনো চাকরির কথা ছিল না।
আজকাল মসজিদে বসে আল্লাহর কাছে একটাই প্রশ্ন – আমি কে? যখন সবকিছু ছিনিয়ে নেয়া হয়, যখন কার্ড, পদবি, অফিস সব শেষ হয়ে যায়, তখন কী থাকে?
হ্যাপি ঘুমের মধ্যে আমার হাত ধরে আছে। পনেরো বছর ধরে। চাকরি থাকুক বা না থাকুক। আরাশ স্বপ্নে হয়তো কোনো নতুন আবিষ্কারের কথা ভাবছে। ওদের কাছে আমি অফিস কর্মচারী নই। আমি স্বামী, বাবা, একজন মানুষ যে ভালোবাসে, যে চেষ্টা করে।
আমার বড় ভাই যখন বলে “তোর আর আমার পথ আলাদা”, সে আমার চাকরির কথা বলে না। সে জানে আমি অন্যরকম। আমি সেই ছেলে যে এখনো বিশ্বাস করে সততার মধ্যে শক্তি আছে। যে চোর-ঘুষখোরদের দেখে মনে মনে প্রশ্ন করে – এরা কি সত্যিই জিতেছে?
কখনো কখনো রাতের নিস্তব্ধতায় মনে হয় আমি একটা যন্ত্র। সকালে উঠি, অফিসে যাই, ফিরি, ঘুমাই। কিন্তু যন্ত্র কি প্রশ্ন করে? যন্ত্র কি আল্লাহর কাছে মুনাজাত করে? যন্ত্রের কি স্বপ্ন থাকে?
আমার সবচেয়ে বড় ভয় – আমি কি ভুল পথে? সবাই যে পথে, আমি কি উল্টো দিকে হাঁটছি? কিন্তু ঠিক পথ মানে কী? যে পথে সবাই সুখী? নাকি যে পথে আল্লাহ খুশি?
বাইরে মুয়াজ্জিনের আওয়াজ। ফজরের। উঠতে হবে। কিন্তু আজ উঠব অফিস কর্মচারী হিসেবে নয়। উঠব হায়দার হিসেবে। যে মানুষ প্রশ্ন করে, যে খোঁজে, যে ভালোবাসে। যার পরিচয় কোনো কার্ডে লেখা নেই।
আমি আয়নায় যাকে দেখেছিলাম, সে হয়তো অচেনা লাগছিল কারণ আমি নিজেকেই চিনি না। পেশার আড়ালে লুকিয়ে রেখেছি আসল আমাকে। কিন্তু আসল আমি কে?
এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনো দিনই পাব না। কিন্তু প্রশ্ন করে যাওয়াটাই হয়তো উত্তর।
একটু ভাবনা রেখে যান