ব্লগ

অদৃশ্য হয়ে যাওয়া

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে আরাশ আমার কাছে এসে বলল, “বাবা, আমাদের পাড়ার রহিম চাচার কথা গুগলে খুঁজে পাই না। উনি কি আসলেই নেই?”

আমি অবাক হয়ে তাকালাম। রহিম চাচা – আমাদের এলাকার সবচেয়ে সৎ মানুষ। যিনি চল্লিশ বছর ধরে মসজিদের ইমামতি করেছেন। যার হাতের রান্না খেয়ে আমরা বড় হয়েছি। যিনি আমার বাবার মৃত্যুর পর আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি গুগলে নেই বলে তার অস্তিত্ব নেই?

“কেন এমন ভাবছিস?”

“বাবা, স্কুলে টিচার বলেছেন যে কিছু জানতে চাইলে গুগল করো। তো আমি ভাবছিলাম, গুগলে যা নেই সেটা কি আসলেই গুরুত্বপূর্ণ?”

আমার ভিতরে একটা অ্যাপ ক্র্যাশ করে গেল যার নাম ছিল “আধুনিক জ্ঞানের অহংকার ভার্সন ১০.০”।

অফিসে জামিউরের সাথে এই কথা বলছিলাম। সে বলল, “হায়দার ভাই, আমার দাদার কোনো ফেসবুক একাউন্ট ছিল না। গুগলে সার্চ দিলে তার কোনো খবর পাওয়া যাবে না। কিন্তু তিনি যে গ্রামে স্কুল বানিয়েছেন, আজও সেখানে বাচ্চারা পড়ে।”

“তার মানে?”

“মানে হলো, অস্তিত্ব আর ডিজিটাল উপস্থিতি এক জিনিস নয়।”

রাতে হ্যাপির সাথে কথা বলছিলাম। “তোর মা’র কোনো সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। কিন্তু তার রান্নার স্বাদ আজও তোর হাতে আছে।”

“হ্যাঁ। আর আমি যখন আরাশকে সেই রেসিপি শেখাই, তখন আমার মা আরাশের মধ্যেও বেঁচে থাকেন।”

“কিন্তু গুগল সার্চ দিলে তোর মা’র কোনো রেকর্ড পাওয়া যাবে না।”

“তাতে কি? তিনি আমার রক্তে আছেন। আরাশের হাসিতে আছেন। এটা গুগলের চেয়ে বেশি স্থায়ী।”

পরদিন আরাশকে নিয়ে রহিম চাচার বাড়ি গেলাম। চাচা আমাদের দেখে খুশি হলেন। চা বানিয়ে দিলেন।

আরাশ বলল, “রহিম চাচা, আপনার কি মনে হয় গুগলে না থাকলে মানুষের অস্তিত্ব থাকে না?”

চাচা হেসে বলললেন, “বাবা, গুগল তো মাত্র কুড়ি বছরের পুরানো। আর আমি সত্তর বছর বাঁচলাম। তাহলে আমি কি পঞ্চাশ বছর অস্তিত্বহীন ছিলাম?”

আরাশ থেমে গেল।

চাচা আবার বলললেন, “দেখো বাবা, আমি হয়তো গুগলে নেই। কিন্তু এই মসজিদের প্রতিটি ইট আমার স্পর্শ পেয়েছে। এই এলাকার প্রতিটি বাচ্চা আমার কাছ থেকে কুরআন শিখেছে। আমি তাদের হৃদয়ে আছি। সেটা গুগলের চেয়ে বড় একাউন্ট।”

ফেরার পথে আরাশ বলল, “বাবা, আমি একটা কথা বুঝলাম।”

“কী?”

“গুগল শুধু তথ্য রাখে। কিন্তু মানুষের আসল অস্তিত্ব অন্যদের জীবনে তার প্রভাবে।”

রাতে নামাজ পড়ে ভাবছিলাম। আমার বাবার কোনো ইমেইল ছিল না, ওয়েবসাইট ছিল না। কিন্তু তিনি আমার প্রতিটি সিদ্ধান্তে আছেন। তার শেখানো সততা আমার চরিত্রে আছে। তার ভালোবাসা আমার হৃদয়ে আছে।

আল্লাহর কথা ভাবলাম। তিনিও গুগলে নেই। কিন্তু তাঁর অস্তিত্ব আমাদের প্রতিটি শ্বাসে, প্রতিটি হৃদস্পন্দনে।

হয়তো যা সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ, তা গুগলে থাকে না। থাকে মানুষের স্মৃতিতে, হৃদয়ে, চরিত্রে।

পরদিন আরাশকে দেখি সে একটা প্রোজেক্ট করছে। “এটা কী?”

“বাবা, আমি আমাদের এলাকার যেসব মানুষ গুগলে নেই কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ, তাদের একটা ডকুমেন্টেশন করছি। রহিম চাচা, আমাদের রিকশাওয়ালা আলতাফ ভাই, সবজিওয়ালি রাশিদা আপা।”

“কেন?”

“কারণ ওরা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। পরের প্রজন্ম জানবেই না যে এই মানুষরা ছিল।”

আমার চোখে জল এসে গেল। এই ছেলেটা এমন একটা কাজ করছে যেটা গুগল কখনো করবে না।

বুঝলাম, গুগলে না থাকা মানে অস্তিত্বহীন হওয়া নয়। বরং গুগলে থাকা মানেও চিরস্থায়ী অস্তিত্ব নয়। সার্ভার ডাউন হতে পারে, ডেটা মুছে যেতে পারে।

কিন্তু একটা মানুষের ভালোবাসা, তার শেখানো মূল্যবোধ, তার রেখে যাওয়া প্রভাব – এগুলো কোনো সার্চ ইঞ্জিনের প্রয়োজন হয় না টিকে থাকতে।

আমরা ডিজিটাল যুগে ভুলে যাচ্ছি যে অস্তিত্বের সবচেয়ে গভীর মাত্রা অদৃশ্য। ভালোবাসা দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। স্মৃতি স্পর্শ করা যায় না, কিন্তু হৃদয়কে পরিবর্তন করতে পারে।

গুগল একটা লাইব্রেরি, জীবন নয়। লাইব্রেরিতে না থাকলে বইটি অস্তিত্বহীন হয় না। হয়তো সেটা কোনো হৃদয়ের তাকে রাখা আছে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *