ব্লগ

মুখের অদৃশ্য ক্ষুধা

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

সন্ধ্যা সাতটা। রাতের খাবার খেয়েছি মাত্র এক ঘণ্টা আগে। পেট ভরা। কিন্তু মুখে একটা অদ্ভুত চাহিদা।

কিছু চাই। জানি না কী।

ফ্রিজে গেলাম। খুললাম। তাকালাম। বন্ধ করলাম। আবার খুললাম।

“কী খুঁজছ?” হ্যাপি জিজ্ঞেস করল।

“জানি না,” আমি বললাম। “কিছু একটা চাই মুখে।”

“খিদে লেগেছে?”

“না। খিদে নেই। কিন্তু মুখে কিছু চাই।”

হ্যাপি হেসে ফেলল। “তুমি আর আরাশ একই রকম। ও-ও এমনই বলে।”

আরাশ পড়ার টেবিল থেকে মাথা তুলল। “কী বলেছি?”

“বলেছিস খিদে নেই, কিন্তু মুখে কিছু চাই।”

“হ্যাঁ!” আরাশ উৎসাহিত হলো। “ঠিক এমনই হয়। পেট ভরা, কিন্তু মুখ খালি খালি লাগে।”

আমি অবাক হলাম। একটা এগারো বছরের ছেলে কী নিখুঁতভাবে বলল!

“এটা কী ব্যাপার?” আমি ভাবলাম।

আমি বুঝতে পারি না এই অনুভূতিটা। পেটে ক্ষুধা নেই। কিন্তু মুখে একটা আকাঙ্ক্ষা। জিহ্বায় একটা আকাঙ্ক্ষা। দাঁতে একটা আকাঙ্ক্ষা।

কিসের আকাঙ্ক্ষা?

মিষ্টি? নোনতা? টক? খাস্তা কিছু?

আমি রান্নাঘরে গেলাম। একটা বিস্কুট নিলাম। খেলাম। কিছু হলো না। আরেকটা নিলাম। তাও কিছু হলো না।

একটা আপেল কাটলাম। খেলাম। না, এটাও নয়।

“আমি কী খুঁজছি?”

হ্যাপি আমাকে দেখে হাসছে। “হায়দার, তুমি কি খাবারের পিছনে পাগল হয়ে গেছ?”

“পাগল না। কিন্তু বুঝতে পারছি না এই অনুভূতিটা কী।”

আমি সোফায় বসলাম। টিভি চালালাম। একটা নাটক চলছে। দেখতে শুরু করলাম। কিন্তু মনোযোগ নেই। মুখে সেই অদ্ভুত অনুভূতি।

আমি হঠাৎ বুঝলাম – এটা ক্ষুধা নয়। এটা অভ্যাস।

খাওয়ার অভ্যাস।

আমি যখন টিভি দেখি, তখন কিছু না কিছু খাই। যখন কাজ করি, তখনও কিছু না কিছু মুখে দিই। যখন বিরক্ত লাগে, তখনও খাই।

খাওয়া আমার একটা আচরণ হয়ে গেছে। একটা প্রতিক্রিয়া।

“আমি কি খাদ্যনির্ভর হয়ে গেছি?”

চিন্তাটা মাথায় আসতেই আমার গা শিউরে উঠল।

আমি আমার বাবার কথা মনে করলাম। তিনি খুব কম খেতেন। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কখনো না। তাঁর মুখে এই অদ্ভুত চাহিদা দেখিনি কখনো।

আর আমি? আমি সারাক্ষণ কিছু না কিছু খুঁজি।

“এটা কি আমার মানসিক সমস্যা?”

আমি আরাশের দিকে তাকালাম। সে-ও তো এমনই করে। তাহলে কি আমার কাছ থেকে সে এই অভ্যাস শিখেছে?

“আরাশ,” আমি ডাকলাম।

“জি বাবা।”

“তুই কেন মনে করিস খিদে নেই অথচ মুখে কিছু চাই?”

আরাশ ভাবল। “জানি না। মুখটা খালি খালি লাগে।”

“কিন্তু পেট তো ভরা।”

“হ্যাঁ। কিন্তু মুখ আর পেট তো আলাদা।”

আমি চমকে গেলাম। মুখ আর পেট আলাদা। কী গভীর কথা বলেছে ছেলেটা!

পেট খাবার চায় বেঁচে থাকার জন্য। শক্তির জন্য।

কিন্তু মুখ কী চায়? স্বাদ? আনন্দ? অভ্যাস?

আমি বুঝলাম – আমার মুখ আমার আবেগের সাথে যুক্ত হয়ে গেছে। যখন বিরক্ত লাগে, খাই। যখন খুশি, খাই। যখন দুশ্চিন্তা, খাই।

খাওয়া আমার আবেগ নিয়ন্ত্রণের একটা উপায় হয়ে গেছে।

“এটা ঠিক না,” আমি নিজেকে বললাম।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আমি একটা পরীক্ষা করলাম। মুখে কিছু চাইছে। কিন্তু কিছু খেলাম না। শুধু পানি খেলাম।

অদ্ভুত ব্যাপার! পানি খাওয়ার পর মুখের সেই আকাঙ্ক্ষাটা কমে গেল।

মানে আমি আসলে তৃষ্ণার্তই ছিলাম। কিন্তু ভেবেছি খাবারের আকাঙ্ক্ষা।

কিন্তু সব সময় কি তৃষ্ণাই? নাকি সত্যিই আমার মুখের একটা আলাদা ক্ষুধা আছে?

আমি ঠিক করলাম – কাল থেকে এই অনুভূতি হলে আগে ভাবব। আমি কী চাই? খাবার, নাকি অন্য কিছু? বিনোদন? মনোযোগ বিভ্রাট? নাকি সত্যিই কোনো স্বাদের প্রয়োজন?

হয়তো আমাদের মুখের নিজস্ব একটা মন আছে। যে মন পেটের মন থেকে আলাদা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *