ব্লগ

অদৃশ্য সুতো

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে বাবার কথা ভাবছিলাম। কেন জানি হঠাৎ তার মুখটা মনে পড়ল। তিনি যখন হাসতেন, চোখের কোণে ভাঁজ পড়ত। ঠিক আরাশের মতো।

দোকানে গেলাম চাল কিনতে। দোকানদার একটা পুরনো গান বাজাচ্ছিল। “তুমি যা বলেছিলে সেই কথাটি মনে আছে…” বাবার প্রিয় গান। তিনি রেডিওতে শুনলে আওয়াজ কমিয়ে দিতেন।

কাকতালীয়? নাকি কিছু একটা?

বাসায় ফিরে হ্যাপি বলল, “আজ তোমার মামা ফোন করেছেন। বলেছেন তোমার বাবার মৃত্যুর দিনটা মনে পড়ে গেছে।”

আমি থমকে গেলাম। আজ তো বাবার মৃত্যুদিন নয়। তাহলে মামার মনে কেন পড়ল? আর আমারই বা কেন বাবার কথা মনে পড়ল?

আমি মামাকে ফোন করলাম। “কেমন আছেন?”

“ভালো। আজ সকালে তোমার বাবার স্বপ্ন দেখেছি। তিনি বলছেন—হায়দারকে খবর দাও, আমি ভালো আছি।”

আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। এটা কি শুধুই কাকতালীয়?

দুপুরে আরাশ স্কুল থেকে ফিরে বলল, “বাবা, আজ আমার দাদার কথা মনে পড়েছে।”

“কেন?”

“জানি না। ক্লাসে বসে হঠাৎ ভাবলাম—দাদা কেমন আছেন?”

আমি আরাশকে জড়িয়ে ধরলাম। তিনজনের মনে একই দিনে একই মানুষের কথা। এটা কি সম্ভব?

সন্ধ্যায় পাড়ার রহিম চাচা এলেন। বললেন, “আজ তোমার বাবার কথা মনে পড়ল। কী ভালো মানুষ ছিলেন।”

এতগুলো কাকতালীয়? নাকি বাবা সত্যিই কোনোভাবে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে তিনি আছেন?

রাতে ভাবলাম—জীবনে এরকম আরো কত ঘটনা ঘটেছে। যেগুলো দেখতে কাকতালীয়, কিন্তু মনে হয় পরিকল্পিত।

হ্যাপির সাথে প্রথম দেখা। সেদিন আমি লাইব্রেরিতে কেন গেলাম? কোনো বই খোঁজার দরকার ছিল না। হঠাৎ মনে হলো—যাই। গিয়ে দেখি হ্যাপি সেই একই বই খুঁজছে যেটা আমি পড়ে রেখেছিলাম।

আমি বলেছিলাম, “এই বইটা আমার কাছে আছে।” সে বলেছিল, “দিবেন?” আমি বলেছিলাম, “একসাথে পড়ি?”

এই ঘটনা কি শুধুই দুর্ঘটনা? নাকি মহাবিশ্ব আমাদের মিলিয়ে দিতে চেয়েছিল?

আরাশের জন্মের দিন। ডাক্তার বলেছিলেন, “আরো দুদিন লাগবে।” কিন্তু সেদিন রাতে হ্যাপির পেটে ব্যথা। হাসপাতালে নিয়ে যেতে হলো। ঠিক তখনই ডাক্টর পাওয়া গেল। না হলে আরেকটা হাসপাতালে যেতে হতো।

আরাশ জন্মাল ১৫ মিনিটে। যদি আমরা দেরি করতাম?

আমার প্রথম চাকরি। ইন্টারভিউর দিন ভুল ঠিকানায় গেছিলাম। অফিস খুঁজতে গিয়ে দেখি রাস্তায় একজন দাঁড়িয়ে। জিজ্ঞেস করলাম, তিনিও সেই অফিসে যাচ্ছেন। একসাথে গেলাম।

পরে জানলাম—তিনি সেই কোম্পানির ম্যানেজার। আমার সাথে কথা বলে খুশি হয়েছেন। তার সুপারিশেই আমার চাকরি হয়েছিল।

ভুল ঠিকানায় যাওয়া আমার ভাগ্য খুলে দিয়েছিল।

জামিউরের সাথে বন্ধুত্ব। কলেজে প্রথম দিন। আমি ভুল ক্লাসে ঢুকেছিলাম। জামিউর আমাকে সাহায্য করেছিল। সেই থেকে বন্ধুত্ব।

যদি আমি ভুল ক্লাসে না যেতাম?

সাইফুলের চাকরি। সে আমার পরামর্শে ডেভেলপমেন্ট শিখেছিল। আমি তাকে বলেছিলাম—”ভবিষ্যতে কম্পিউটারের চাহিদা বাড়বে।” নিজেও জানতাম না কেন বলেছিলাম।

আজ সে সফল। আমাকে ধন্যবাদ দেয়। কিন্তু আমি জানি—এটা আমার কৃতিত্ব নয়। এটা কোনো অদৃশ্য পরিকল্পনার অংশ।

আমি ভাবলাম—এই ঘটনাগুলো কি সত্যিই র‍্যান্ডম? নাকি কোনো প্যাটার্ন আছে?

হয়তো জীবনে কিছু মুহূর্ত আছে যখন মহাবিশ্বের সব কিছু মিলে যায়। সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষের সাথে দেখা।

কিন্তু আমরা সেটা খেয়াল করি না। আমরা ভাবি—কাকতালীয়।

হয়তো কাকতালীয় বলে কিছু নেই। সব কিছুর একটা মানে আছে। একটা সংযোগ আছে।

পরদিন সকালে একটা এক্সপেরিমেন্ট করলাম। মনে মনে প্রশ্ন করলাম—”আমি সঠিক পথে আছি?”

তারপর চোখ বুজে রাস্তায় হাঁটতে শুরু করলাম। যেখানে পা পড়বে, সেখানেই দাঁড়াবো।

দাঁড়ালাম একটা পোস্টারের সামনে। লেখা—”Never Give Up.” কখনো হাল ছেড়ো না।

কাকতালীয়? নাকি উত্তর?

আমি হেসে ফেললাম। হয়তো মহাবিশ্ব সত্যিই আমাদের সাথে কথা বলে। আমরা শুধু শুনি না।

বাসায় ফিরে হ্যাপিকে বললাম, “আমার মনে হয় আমাদের জীবনে কোনো দুর্ঘটনা নেই।”

“মানে?”

“সব কিছুর একটা কারণ আছে। একটা সময় আছে। একটা উদ্দেশ্য আছে।”

হ্যাপি বলল, “তাহলে আমাদের দেখা হওয়াও?”

“পরিকল্পিত। মহাবিশ্বের পরিকল্পনা।”

আরাশ এসে বলল, “তাহলে আমার জন্মও?”

“অবশ্যই। তুমি ঠিক সময়ে এসেছো। আমাদের জীবনে।”

রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম—হয়তো আমরা সবাই অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। একটা বিশাল জালের অংশ।

যখন একটা সুতো কাঁপে, পুরো জাল কাঁপে।

আমার আজকের চিন্তা হয়তো অন্য কারো জীবনে প্রভাব ফেলবে। অন্য কারো চিন্তা আমার জীবনে।

এভাবেই চলে সিনক্রোনিসিটি। রহস্যময় সমাপতন।

আর এই উপলব্ধিটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *