ব্লগ

যে শহরে থাকি কিন্তু কখনো ম্যাপে খুঁজে পাই না

নভেম্বর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া
শেয়ার

অদৃশ্য শহর

একটি কাল্পনিক গল্প


আমজাদ হোসেন গুগল ম্যাপে নিজের বাড়ির ঠিকানা লিখলেন। স্ক্রিনে এলো: “No results found.”

তিনি আবার লিখলেন। আবার একই উত্তর।

তিনি বুঝলেন — তাঁর শহরের কোনো অস্তিত্ব নেই।


শহরের নাম মধুগ্রাম।

ছোট্ট একটা জায়গা। তিন হাজার মানুষের বসতি। একটা বাজার, দুটো স্কুল, একটা মসজিদ, একটা পুকুর। সবকিছু আছে।

শুধু ম্যাপে নেই।

আমজাদ হোসেন জন্ম থেকে এখানে থাকেন। বাবা থাকতেন, দাদা থাকতেন। তিন প্রজন্ম ধরে এই মাটিতে শিকড়।

কিন্তু কোনো সরকারি কাগজে এই মধুগ্রাম নেই।

জন্মসনদে লেখা “চরভদ্রা।” জাতীয় পরিচয়পত্রে লেখা “চরভদ্রা।” পাসপোর্টে লেখা “চরভদ্রা।”

চরভদ্রা কোথায় আমজাদ হোসেন জানেন না। কোনোদিন যাননি। শুধু জানেন কাগজে সেই নাম লেখা আছে।


সমস্যা শুরু হলো যখন ছেলে রাহাতকে ঢাকায় পড়তে পাঠাতে হলো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফর্মে ঠিকানা লেখার জায়গা। রাহাত লিখলো “মধুগ্রাম।”

অফিস থেকে ফোন এলো।

“এই জায়গা কোথায়?”

“আমাদের বাড়ি।”

“কিন্তু এই নাম তো কোনো জেলায় নেই।”

রাহাতকে বলতে হলো চরভদ্রা। যে জায়গা সে কোনোদিন দেখেনি।


কুরিয়ার সার্ভিসের সাথে যুদ্ধ প্রতিদিনের।

আমজাদ হোসেনের স্ত্রী জাহানারা অনলাইনে একটা শাড়ি অর্ডার করেছিলেন।

তিন দিন পর ফোন এলো।

“ম্যাডাম, আপনার ঠিকানা আমাদের সিস্টেমে নেই।”

“কীভাবে নেই? আমি তো এখানেই থাকি।”

“আপনার পিন কোড দিয়ে সার্চ করলে কিছু আসে না।”

“পিন কোড তো দিয়েছি।”

“ঐ পিন কোডে এই এলাকা নেই।”

শাড়িটা আর আসেনি।


একবার জরুরি অবস্থা হয়েছিল।

আমজাদ হোসেনের বুকে ব্যথা। রাত দুটো। অ্যাম্বুলেন্স ডাকলেন।

“ঠিকানা বলেন।”

“মধুগ্রাম, হাসান মিয়ার বাড়ির পাশে।”

“মধুগ্রাম কোথায়?”

“চরভদ্রা থেকে পশ্চিমে পাঁচ কিলোমিটার।”

“ভাই, আমাদের GPS-এ এই জায়গা দেখাচ্ছে না।”

“আমি বুঝিয়ে বলছি, শুনেন—”

“ভাই, আমরা GPS ছাড়া যেতে পারি না। দুঃখিত।”

সেই রাতে প্রতিবেশী করিম চাচার ভ্যানে করে হাসপাতালে গিয়েছিলেন।

বুকে ব্যথা ছিল গ্যাসের। কিন্তু যদি হার্ট অ্যাটাক হতো?


ডাকপিয়ন হারুন মিয়া একমাত্র মানুষ যে মধুগ্রাম চেনে।

তিরিশ বছর ধরে চিঠি দিয়ে যাচ্ছেন।

কিন্তু গত বছর হারুন মিয়া অবসরে গেছেন। নতুন পিয়ন এসেছে।

সে বলে, “এই এলাকা আমার তালিকায় নেই।”

এখন চিঠি আসে না।


আমজাদ হোসেন একদিন উপজেলা অফিসে গেলেন।

“স্যার, আমাদের মধুগ্রাম কেন কোনো ম্যাপে নেই?”

অফিসার কম্পিউটারে কিছু দেখলেন।

“মধুগ্রাম বলে কিছু নেই।”

“কীভাবে নেই? আমি সেখানে থাকি!”

“কাগজে যা আছে তাই সত্য। কাগজে মধুগ্রাম নেই।”

“কিন্তু তিন হাজার মানুষ সেখানে থাকে!”

অফিসার কাঁধ ঝাঁকালেন। “তাহলে তারা চরভদ্রায় থাকে। কারণ ঐ এলাকা চরভদ্রার অধীনে।”

“চরভদ্রা তো দশ কিলোমিটার দূরে!”

“কাগজে তো কাছে।”


আমজাদ হোসেন বুঝলেন — কাগজই সত্য। বাস্তব মিথ্যা।

তিন হাজার মানুষ যেখানে থাকে, সেই জায়গার চেয়ে একটা কাগজের টুকরো বেশি শক্তিশালী।


মধুগ্রামে একটা প্রাথমিক স্কুল আছে। নাম “মধুগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।”

কিন্তু সরকারি তালিকায় এই স্কুল নেই।

শিক্ষকরা বেতন পান চরভদ্রা স্কুলের নামে। ছাত্রদের সার্টিফিকেটে লেখা চরভদ্রা।

প্রধান শিক্ষক আলম স্যার বলেন, “আমরা ভূতের স্কুলে পড়াই। যে স্কুলের অস্তিত্ব নেই।”


একবার নির্বাচন হলো।

মধুগ্রামে একটা ভোট কেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইসি বললো, “এই জায়গা আমাদের রেকর্ডে নেই।”

তিন হাজার মানুষকে যেতে হলো চরভদ্রায়। দশ কিলোমিটার হেঁটে।

অনেকে যাননি। ভোট দেননি।

কারণ তাদের শহরের অস্তিত্ব নেই।


জাহানারা একদিন বললেন, “আমরা কি আসলেই আছি?”

আমজাদ হোসেন চুপ করে রইলেন।

“মানে, যদি কোনো কাগজে আমাদের শহর না থাকে, তাহলে আমরা থাকি কীভাবে?”

“আমরা তো আছি। তুমি আছো, আমি আছি, রাহাত আছে।”

“কিন্তু প্রমাণ কই?”

প্রমাণ নেই। সবকিছু আছে, প্রমাণ নেই।


রাহাত একবার ঢাকা থেকে বন্ধুদের নিয়ে এসেছিল।

GPS চালিয়ে এসেছিল। GPS বলছিল “চরভদ্রা।” কিন্তু তারা চরভদ্রা পেরিয়ে আরো পশ্চিমে গেল।

GPS বললো “You have arrived at your destination।”

কিন্তু সামনে কিছু নেই। খালি মাঠ।

রাহাত বললো, “আরো সামনে।”

বন্ধুরা বললো, “সামনে তো কিছু নেই।”

“আছে। ম্যাপে নেই।”

আরো দুই কিলোমিটার গিয়ে মধুগ্রাম পেলো।

এক বন্ধু বললো, “এই জায়গা ম্যাপে নেই কেন?”

রাহাত বললো, “কেউ জানে না।”


আমজাদ হোসেন মাঝে মাঝে ভাবেন — এই শহর কি সত্যিই আছে?

তিনি দেখতে পান। ছুঁতে পারেন। গন্ধ পান।

কিন্তু কম্পিউটার বলছে নেই। সরকার বলছে নেই। ম্যাপ বলছে নেই।

কোনটা সত্য?

তাঁর চোখ? নাকি কম্পিউটার?


প্রতিবেশী মতিন সাহেব বলেন, “আমরা invisible মানুষ। যাদের দেখা যায় কিন্তু গোনা হয় না।”

সত্যি তো।

আদমশুমারিতে মধুগ্রামের জনসংখ্যা যোগ হয় চরভদ্রার সাথে। আলাদা করে গণনা নেই।

কর দেন, কিন্তু কর রেকর্ড অন্য জায়গায়।

ভোট দেন, কিন্তু ভোটার তালিকা অন্য জায়গায়।

জন্ম এখানে, মৃত্যু এখানে। কিন্তু জন্ম-মৃত্যুর রেকর্ড অন্য জায়গায়।

মধুগ্রাম একটা ছায়া।


একদিন এক সাংবাদিক এসেছিলেন।

“ম্যাপে নেই এমন শহর” — এই নিয়ে রিপোর্ট করবেন।

ছবি তুললেন। ভিডিও করলেন। মানুষের সাক্ষাৎকার নিলেন।

রিপোর্ট প্রকাশ হলো।

কিছুই বদলালো না।


আমজাদ হোসেনের নাতনি তিথি চার বছর বয়সে জিজ্ঞেস করলো, “দাদু, আমাদের বাড়ি কোথায়?”

“মধুগ্রামে।”

“মধুগ্রাম কোথায়?”

আমজাদ হোসেন ভাবলেন কী উত্তর দেবেন।

“এখানে।”

“কিন্তু মা বলে আমাদের ঠিকানা চরভদ্রা।”

“কাগজে চরভদ্রা। আসলে মধুগ্রাম।”

তিথি বুঝলো না। আমজাদ হোসেনও বোঝাতে পারলেন না।

কাগজ আর বাস্তবের ফারাক একটা চার বছরের বাচ্চাকে কীভাবে বোঝানো যায়?


রাতে ঘুমানোর আগে আমজাদ হোসেন জানালা দিয়ে বাইরে তাকান।

মধুগ্রাম দেখেন।

রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট জ্বলছে। কোথাও কুকুর ডাকছে। দূরে মসজিদের মাইকে আজান হচ্ছে।

সব আছে।

কিন্তু কোনো স্যাটেলাইট এই আলো দেখতে পায় না। কোনো ড্রোন এই রাস্তা দেখে না। কোনো কম্পিউটার এই মসজিদ চেনে না।

মধুগ্রাম একটা অদৃশ্য শহর।

তিন হাজার অদৃশ্য মানুষের অদৃশ্য জীবন।


জাহানারা বলেন, “একদিন হয়তো ম্যাপে আসবে।”

আমজাদ হোসেন বলেন, “হয়তো।”

কিন্তু মনে মনে জানেন — আসবে না।

কারণ যা কাগজে নেই, তা কোনোদিন “সত্য” হয় না।

মধুগ্রাম থাকবে। মানুষ থাকবে। জীবন থাকবে।

শুধু অস্তিত্ব থাকবে না।


আজ সকালে আমজাদ হোসেন আবার গুগল ম্যাপ খুললেন।

লিখলেন “মধুগ্রাম।”

স্ক্রিনে এলো: “No results found.”

তিনি ফোন রেখে দিলেন।

তারপর বাইরে বেরিয়ে গেলেন।

মধুগ্রামের রাস্তায় হাঁটতে লাগলেন।

যে শহরের অস্তিত্ব নেই, সেই শহরের সত্যিকারের মাটিতে।


[এই গল্পের সকল চরিত্র, স্থান ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।]

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *