আজ রাতে ডিসকভারি চ্যানেলে ব্ল্যাক হোলের একটা ডকুমেন্টারি দেখছিলাম। আরাশও দেখছিল। পর্দায় দেখানো হচ্ছে কীভাবে ব্ল্যাক হোল সব কিছু গিলে ফেলে। এমনকি আলোও পালাতে পারে না।
“বাবা, এটা কী?” আরাশ জিজ্ঞেস করল।
“এটা মহাকাশের একটা জায়গা যেখানে মাধ্যাকর্ষণ এত শক্তিশালী যে কিছুই বের হতে পারে না।”
“ভয়ানক।”
“হ্যাঁ। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো—এটা দেখা যায় না। শুধু এর প্রভাব দেখা যায়।”
আরাশ ঘুমিয়ে পড়ার পর আমি ভাবতে লাগলাম। আমার জীবনেও কি এরকম ব্ল্যাক হোল আছে? অদৃশ্য কিছু যা আমাকে টেনে নিয়ে যায়?
আমার প্রথম মনে পড়ল মায়ের কথা। মা নেই আর পাঁচ বছর। কিন্তু এখনো তার একটা অদৃশ্য টান অনুভব করি। যখন কোনো সমস্যায় পড়ি, মনে হয় মায়ের কাছে যেতে চাই। তার পরামর্শ নিতে চাই।
এই টান দেখা যায় না। কিন্তু খুবই শক্তিশালী। আমার সব সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
তারপর মনে পড়ল আমার পুরনো অভ্যাসের কথা। সিগারেট। ছেড়েছি দুবছর হলো। কিন্তু এখনো মাঝে মাঝে একটা টান অনুভব করি। বিশেষ করে যখন স্ট্রেসে থাকি।
এই টানও অদৃশ্য। কিন্তু শক্তিশালী। মাঝে মাঝে আমাকে প্রায় পরাজিত করে দেয়।
আমি ভাবলাম—হ্যাপিও কি আমার জীবনের একটা ব্ল্যাক হোল? কিন্তু ভালো ধরনের। তার একটা অদৃশ্য আকর্ষণ আছে যা আমাকে সবসময় তার কাছে টেনে নিয়ে যায়।
অফিসে থাকলেও মন বাসায়। তার কাছে। এই টান দেখা যায় না। কিন্তু আমার সব কাজে প্রভাব ফেলে।
আরাশও তাই। সে আমার জীবনের একটা মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র। তার চারপাশে আমার পুরো জীবন ঘুরে।
কিন্তু সব ব্ল্যাক হোল তো ক্ষতিকর নয়। কিছু আছে যা আমাদের কেন্দ্রীভূত রাখে। দিক দেয়।
আমার লেখালেখিও একটা ব্ল্যাক হোল। যখন লিখি, পুরো মন সেখানে চলে যায়। সময়ের হিসাব থাকে না। চারপাশের কিছু মনে থাকে না।
এই টান ভালো। এটা আমাকে আমার প্রকৃত সত্তার কাছে নিয়ে যায়।
কিন্তু খারাপ ব্ল্যাক হোলও আছে। আমার দুশ্চিন্তার অভ্যাস। একবার চিন্তা শুরু করলে আর থামতে পারি না। নেগেটিভ চিন্তা আরো নেগেটিভ চিন্তা টেনে আনে।
এটাও একটা ব্ল্যাক হোল। যেখানে আমার মানসিক শক্তি হারিয়ে যায়।
হ্যাপিকে বললাম, “তুমি কি মনে করো আমাদের জীবনে অদৃশ্য শক্তি কাজ করে?”
“কেমন শক্তি?”
“যেমন তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা। এটা দেখা যায় না। কিন্তু আমার সব কাজে প্রভাব ফেলে।”
হ্যাপি হেসে বলল, “হ্যাঁ। আমারও তোমার প্রতি একটা টান আছে। কিন্তু এটা ব্ল্যাক হোলের মতো ভয়ানক নয়।”
“কেন? ব্ল্যাক হোল মানেই তো খারাপ নয়। এটা মাধ্যাকর্ষণ। যা জিনিসগুলোকে একসাথে রাখে।”
আমি আরো ভাবলাম। আমার বন্ধুত্বগুলোও একেকটা মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্র। জামিউর, সাইফুল—তাদের সাথে একটা অদৃশ্য বন্ধন আছে।
যখনই তাদের সাহায্য লাগে, আমি ছুটে যাই। এই টান স্বেচ্ছায়। কিন্তু শক্তিশালী।
আমার কাজের প্রতিও একটা টান আছে। ভালো কাজ করার। সৎ থাকার। এটাও অদৃশ্য। কিন্তু আমার চরিত্র গঠন করে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্ল্যাক হোল হয়তো আমার নিজের ভেতরে। আমার পরিচয়ের খোঁজ। আমি কে? কেন আছি? কী করবো?
এই প্রশ্নগুলো আমাকে ক্রমাগত টেনে নিয়ে যায়। গভীর চিন্তায়। অস্তিত্বের অন্ধকার কোণে।
মাঝে মাঝে এই টান ক্ষতিকর। আমি অতিরিক্ত ভেবে অস্থির হয়ে যাই।
কিন্তু মাঝে মাঝে এই টান উপকারী। আমাকে আরো সচেতন করে। আরো মানবিক করে।
আমি বুঝলাম—জীবনে বিভিন্ন ধরনের ব্ল্যাক হোল আছে। কিছু ধ্বংসাত্মক। কিছু সৃজনশীল।
ধ্বংসাত্মকগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে। যেমন—নেগেটিভ চিন্তা, খারাপ অভ্যাস, বিষাক্ত সম্পর্ক।
আর সৃজনশীলগুলোকে আলিঙ্গন করতে হবে। যেমন—ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, সৃষ্টিশীল কাজ।
কারণ জীবনে মাধ্যাকর্ষণ দরকার। নইলে আমরা ভেসে যাবো। হারিয়ে যাবো।
সঠিক ব্ল্যাক হোল আমাদের কেন্দ্রীভূত রাখে। অর্থ দেয়। দিক দেয়।
আর এই উপলব্ধিটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
একটু ভাবনা রেখে যান