গতমাসে একটা কাজের জন্য সিলেট যেতে হয়েছিল। চাকরির ইন্টারভিউ। হ্যাপি বলেছিল, “রাতেই ফিরে আসবে।” আমি বলেছিলাম, “দেখি।” মনে মনে ভেবেছিলাম—দু’দিন থেকে আসি। কতদিন তো ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে।
বাসে উঠে বসলাম। চট্টগ্রামের কালো ধোঁয়া ছেড়ে যেই না বাস এগিয়ে চলল, অমনি চোখে পড়ল সবুজ। চারিদিকে সবুজ। পাহাড়, জঙ্গল, নদী—যেন প্রকৃতি নিজেই একটা চিত্রকর হয়ে এঁকে রেখেছে সব।
আমি জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে তাকিয়ে রইলাম। এই যে সৌন্দর্য—এটা কি সবসময় এখানে ছিল? আমি কেন আগে দেখিনি? নাকি দেখার চোখই ছিল না?
শহরে থাকতে থাকতে মনে হয় আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। চোখ ছিল শুধু সমস্যা দেখার জন্য। চাকরি নেই, টাকা নেই, ভবিষ্যৎ অন্ধকার—এসবই দেখতাম। কিন্তু এই সৌন্দর্য দেখতাম না।
বাস থামল একটা চা-স্টলে। আমি নেমে চা খেতে গেলাম। দোকানদার বলল, “কোথা থেকে আসছেন?” “চট্টগ্রাম।” “প্রথমবার এদিকে?” “হ্যাঁ।” “তাহলে দেখবেন, এখানে অনেক সুন্দর জায়গা আছে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি এখানে জন্মেছেন?” “হ্যাঁ।” “প্রতিদিন এই সৌন্দর্য দেখে ভালো লাগে?” লোকটা হেসে বলল, “ভালো লাগে। কিন্তু আপনারা যেমন মুগ্ধ হন, আমরা সেরকম হই না। অভ্যাস হয়ে গেছে।”
আমি ভাবলাম—এটাই কি সমস্যা? আমরা যা পাই, তাতে অভ্যস্ত হয়ে যাই। তখন আর সৌন্দর্য দেখি না। শুধু দেখি অভাব। যা নেই, তার জন্য কান্নাকাটি।
বাসে ফিরে বসলাম। এবার আরো মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম। প্রতিটি পাহাড়ের আকৃতি আলাদা। প্রতিটি গাছের রং আলাদা। প্রতিটি নদীর গতি আলাদা।
মনে পড়ল আরাশের কথা। গতকাল সে বলেছিল, “বাবা, আমরা কেন ভ্রমণ করি না?” আমি বলেছিলাম, “টাকা নেই।” “কিন্তু দেখার জন্য টাকা লাগে?” “ভ্রমণ করতে টাকা লাগে।” “কিন্তু দেখতে টাকা লাগে না।”
আজ বুঝি আরাশ ঠিক বলেছিল। দেখতে টাকা লাগে না। লাগে শুধু চোখ। আর খোলা মন।
সিলেট পৌঁছে গেলাম সন্ধ্যায়। হোটেলে উঠলাম। কিন্তু ঘরে বসে থাকতে মন চাইল না। বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়।
সিলেটের রাস্তা আলাদা। মানুষজনের চলাফেরা আলাদা। ভাষা আলাদা। এই যে আলাদা হওয়া—এটা কী? শুধু ভৌগোলিক দূরত্ব? নাকি সাংস্কৃতিক পার্থক্য?
আমি একটা চায়ের দোকানে বসলাম। পাশের টেবিলে কয়েকজন মানুষ সিলেটি ভাষায় কথা বলছে। আমি কিছু বুঝতে পারছি না। কিন্তু তাদের কণ্ঠস্বরে একটা সুর আছে। একটা মিষ্টতা আছে।
আমি ভাবলাম—প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের কণ্ঠস্বর আলাদা। যেমন প্রতিটি পাহাড়ের আকৃতি আলাদা। এই বৈচিত্র্য কেন? কে ঠিক করেছে যে চট্টগ্রামের মানুষ এক রকম, সিলেটের মানুষ আরেক রকম?
পরদিন সকালে ইন্টারভিউ দিলাম। ভালো হয়েছে। কিন্তু ফেরার তাড়া নেই। আমি ঠিক করলাম—একটু ঘুরে দেখবো।
রিকশা করে গেলাম জাফলং। পাহাড় আর নদীর মিলনস্থল। এমন জায়গা আমি কখনো দেখিনি। পাহাড় যেন আকাশ ছুঁয়ে আছে। আর নদী যেন পাহাড়ের পায়ে বসে গান গাইছে।
আমি নদীর ধারে দাঁড়িয়ে রইলাম। এই যে প্রকৃতি—এটা কি আমার জন্য সাজানো? নাকি আমি এর একটা ছোট্ট অংশ? আমি কি এই সৌন্দর্য দেখছি, নাকি এই সৌন্দর্য আমাকে দেখছে?
একটা ছোট্ট ছেলে এসে বলল, “ভাইয়া, নৌকায় যাবেন?” আমি বললাম, “কোথায়?” “নদীতে। আরো সুন্দর জায়গা দেখাবো।”
আমি নৌকায় উঠে বসলাম। ছেলেটা দাঁড় টানতে লাগল। নৌকা ভেসে চলল নদীর বুকে। দুপাশে পাহাড়। মাথার উপর আকাশ। আর আমি মাঝখানে—এক ছোট্ট মানুষ।
কিন্তু এই ছোট হওয়ার মধ্যে একটা আনন্দ আছে। একটা নিরাপত্তা আছে। আমি বুঝলাম—আমি এই বিশাল প্রকৃতির অংশ। আমার চাকরি না থাকলে কী? আমি এই মহাবিশ্বের একটা অংশ।
নৌকা থেকে নেমে ফিরে এলাম। কিন্তু সেই পুরনো আমি আর নেই। কিছু একটা বদলে গেছে। যেন আমার চোখে নতুন চশমা পরানো হয়েছে।
বাসে করে ফেরার পথে ভাবলাম—এই যে সৌন্দর্য দেখলাম, এটা কি শুধু জাফলংয়ে আছে? নাকি সব জায়গায় আছে? আমি কি শুধু দেখার অভ্যাস হারিয়ে ফেলেছিলাম?
ঢাকায় ফিরে হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “কেমন লাগল?” আমি বললাম, “চোখ খুলে গেছে।” “মানে?” “বুঝেছি—সৌন্দর্য সব জায়গায় আছে। শুধু দেখার চোখ চাই।”
আরাশ এসে বলল, “বাবা, কিছু এনেছো?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” “কী?” “নতুন চোখ।”
আরাশ হেসে বলল, “চোখ তো একই।” আমি বললাম, “না, এই চোখ দিয়ে আমি অন্যভাবে দেখতে পাবো।”
সেদিন থেকে আমি বাসায় বসেও ভ্রমণ করি। বারান্দা থেকে আকাশ দেখি। রাস্তার গাছগুলো দেখি। মানুষের মুখ দেখি। সব কিছুতেই নতুন কিছু আবিষ্কার করি।
আমি বুঝেছি—ভ্রমণ মানে শুধু দূরে যাওয়া নয়। ভ্রমণ মানে নতুন চোখে দেখা। আর সেই চোখ যেকোনো জায়গায় পাওয়া যায়।
শুধু খোলা মন চাই।
একটু ভাবনা রেখে যান