ব্লগ

যারা আলো হয়ে জ্বলে

নভেম্বর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া
শেয়ার

অক্ষম কে?

সেদিন সকালে আমি শিখেছিলাম—চোখ থাকলেই দেখা যায় না, পা থাকলেই হাঁটা যায় না।

মিরপুর মোড়ের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সকাল আটটা। অফিসের তাড়া। হাতে চায়ের কাপ। তখনই দেখলাম তাকে। হুইলচেয়ারে একজন মানুষ। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি হবে। নাম জানি না, কিন্তু চেহারাটা মনে গেঁথে গেছে। রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছে। সিগন্যাল সবুজ হলো, গাড়ি থামল না। হলুদ হলো, স্পিড বাড়ল। লাল হলো, তখনও কেউ জায়গা দিল না। সে অপেক্ষা করল। তারপর নিজেই ঢুকে পড়ল গাড়ির স্রোতে। দুই হাতে চাকা ঘোরাচ্ছে। ঘামে ভিজে যাচ্ছে গলা। একটা বাস প্রায় ছুঁয়ে গেল। একটা রিকশা গালি দিয়ে গেল। কিন্তু সে থামল না। আমি চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে দেখলাম। মনে হলো, এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ দেখছি। একটা মানুষ, যার শরীর তাকে সাথ দিচ্ছে না, সে লড়ছে এমন একটা শহরের সাথে যে তার জন্য তৈরিই হয়নি। আর আমি? আমার দুটো সুস্থ পা আছে, অথচ রাস্তা পার হতে গেলে ভয় পাই।

সেদিন থেকে একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে—অক্ষম আসলে কে?

রাকিব আমার স্কুলের বন্ধু ছিল। ক্লাস সেভেনে একটা বাস অ্যাক্সিডেন্টে তার মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। ডাক্তার বলেছিল, আর কোনোদিন হাঁটতে পারবে না। সেদিন আমরা সবাই কেঁদেছিলাম। রাকিবের মা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। বাবা দেওয়ালে মাথা ঠুকছিলেন। কিন্তু রাকিব? সে একটাও কাঁদেনি। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বলেছিল, “পা দিয়ে যদি না হাঁটতে পারি, মাথা দিয়ে হাঁটব।” আমরা ভেবেছিলাম শকে আছে, বুঝতে পারছে না কী হয়েছে। কিন্তু না। সে বুঝেছিল। আমাদের চেয়ে অনেক গভীরভাবে বুঝেছিল।

দশ বছর পরে রাকিব এখন একটা সফটওয়্যার কোম্পানির ফাউন্ডার। পঞ্চাশ জন মানুষ কাজ করে তার আন্ডারে। গত বছর সে ফোর্বসের “৩০ আন্ডার ৩০” লিস্টে জায়গা পেয়েছে। আর আমাদের ব্যাচের বাকি বন্ধুরা? যাদের দুটো সুস্থ পা ছিল? বেশিরভাগ এখনো খুঁজে বেড়াচ্ছে জীবনে কী করবে।

এই যে পার্থক্য, এটা কোথা থেকে আসে? শরীর থেকে? না। মন থেকে।

আমার পাশের বাসায় থাকে নাফিসা। জন্ম থেকে কানে শোনে না। কিন্তু তার হাসি দেখলে মনে হয় পৃথিবীর সব সুখ ওর কাছে জমা আছে। সে হাত দিয়ে কথা বলে। তার প্রতিটা gesture যেন একটা কবিতা। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, কষ্ট হয় না? সে হেসে sign language-এ বলল, “কষ্ট তো তোমাদের হয়, যারা শুনেও শোনো না। আমি না শুনেও বুঝি।” সেদিন অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। ভাবছিলাম, এই মেয়ে আমাকে এমন একটা সত্য বলে দিল যা হাজার বই পড়েও শিখতে পারতাম না।

আমাদের সমাজ “প্রতিবন্ধী” শব্দটা ব্যবহার করে এমনভাবে, যেন এটা একটা অপরাধ। যেন এই মানুষগুলো বোঝা। যেন এরা কম। কিন্তু আমি যতদিন বেঁচে আছি, যত মানুষ দেখেছি, একটা জিনিস বারবার প্রমাণিত হয়েছে—শরীরের সীমাবদ্ধতা কাউকে ছোট করে না, মনের সীমাবদ্ধতা করে।

ধানমন্ডি লেকের পাশে প্রতি সন্ধ্যায় একজন অন্ধ গায়ক বসে। নাম শফিক। তার গলায় যে সুর আছে, সেটা শুনলে মনে হয় আকাশ থেকে নামছে। একদিন তার পাশে বসলাম। জিজ্ঞেস করলাম, অন্ধকারে থাকতে কেমন লাগে? শফিক হাসল। বলল, “ভাই, অন্ধকার তো তোমরা দেখো। আমি দেখি না। আমার জগতে শুধু শব্দ আছে, স্পর্শ আছে, গন্ধ আছে। তোমরা চোখ দিয়ে এত কিছু দেখো যে বাকি ইন্দ্রিয়গুলো ভুলে যাও। আমি ভুলিনি।” সেদিন বুঝলাম, আমরা যাকে অভাব ভাবি, সেটা আসলে অন্যভাবে পূর্ণতা।

কিন্তু সমস্যা হলো, এই দেশ তাদের জন্য তৈরি না। ফুটপাথে র‌্যাম্প নেই। বাসে হুইলচেয়ার তোলার ব্যবস্থা নেই। অফিসগুলোতে লিফট থাকলেও সেটা কাজ করে না। স্কুলে বিশেষ শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। চাকরির ইন্টারভিউতে তাদের দেখলেই মনে করা হয়, এরা পারবে না। এই যে বারবার “তুমি পারবে না” শোনা, এটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। শরীরের নয়, সমাজের।

তারপরও তারা এগিয়ে যায়। প্রতিটা সিঁড়ি যেখানে আমাদের এক সেকেন্ড লাগে, তাদের লাগে দশ মিনিট। কিন্তু তারা ওঠে। প্রতিটা দরজা যা আমাদের জন্য খোলা, তাদের জন্য বন্ধ। কিন্তু তারা ঠেলে খোলে। প্রতিটা “না” যা আমাদের থামিয়ে দেয়, তারা সেটাকে “হ্যাঁ”-তে বদলে দেয়। কীভাবে? শুধুমাত্র মনের জোরে।

আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি—আমার কাছে সব আছে। দুটো হাত, দুটো পা, দুটো চোখ, দুটো কান। তারপরও আমি কতবার হাল ছেড়ে দিয়েছি? কতবার বলেছি, “আমি পারব না”? কতবার ছোট ছোট বাধায় থেমে গেছি?

অথচ এই মানুষগুলো, যাদের শরীর প্রতিদিন তাদের সাথে যুদ্ধ করে, তারা কখনো থামে না। তারা জানে, থামা মানে হেরে যাওয়া। আর হেরে যাওয়া তাদের অপশন না।

গতকাল সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পথে সেই হুইলচেয়ারের মানুষটাকে আবার দেখলাম। এবার সে রাস্তা পার হচ্ছিল না। একটা চায়ের দোকানে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিল। হাসছিল। জোরে জোরে কথা বলছিল। তার চোখে যে আলো দেখলাম, সেটা আমার চোখে নেই। তার গলায় যে প্রাণ শুনলাম, সেটা আমার গলায় নেই।

সে জীবনকে উদযাপন করছিল। আমি? আমি শুধু পার করছিলাম।

এখানেই পার্থক্য। কেউ কেউ শুধু বাঁচে। দিন যায়, রাত আসে, আবার দিন আসে। একঘেয়ে, ক্লান্ত, অর্থহীন বেঁচে থাকা। আর কেউ কেউ জ্বলে। প্রতিটা মুহূর্তকে আলো করে রাখে। নিজের জন্য, অন্যের জন্য।

যারা জ্বলে, তারাই আলো হয়ে থেকে যায়। বাকিরা অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

তাহলে অক্ষম কে? যার শরীরে কিছু নেই, কিন্তু মনে সবকিছু আছে? নাকি যার শরীরে সব আছে, কিন্তু মনে কিছুই নেই?

আমি এখনো খুঁজছি আমি কোন দলে। কিন্তু একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি—শুধু বাঁচতে চাই না। জ্বলতে চাই। সেই মানুষগুলোর মতো, যারা শরীরে ভাঙা কিন্তু আত্মায় অটুট। যারা প্রতিদিন প্রমাণ করে, সত্যিকারের শক্তি পেশিতে থাকে না, থাকে বুকের ভেতরে। সত্যিকারের দৃষ্টি চোখে থাকে না, থাকে মনে। সত্যিকারের গতি পায়ে থাকে না, থাকে স্বপ্নে।

তারাই আসল মানুষ। তারাই পৃথিবীর আলো। আর আমরা, যারা নিজেদের “সক্ষম” মনে করি? আমাদের উচিত তাদের কাছে বসে শেখা—বেঁচে থাকা আর জীবন্ত থাকা এক জিনিস না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *