ব্লগ

যে অক্ষরগুলো হারিয়ে যায়

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গতকাল রাতে হ্যাপিকে একটা মেসেজ পাঠাতে বসেছিলাম। সে আরাশকে নিয়ে তার মায়ের বাড়ি গিয়েছিল। একা একা অনেক কথা মনে হচ্ছিল। ভাবলাম ফোনে টাইপ করে পাঠিয়ে দিই।

“তোমাকে মিস করছি” – এই সাধারণ কথাটা লিখতে বসলাম।

কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। “ত” অক্ষরটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিবোর্ডে আছে, কিন্তু যেন আমার মাথা থেকে মুছে গেছে। “ত” কোথায়? কেমন দেখতে?

অনেক চেষ্টা করে “তোমাকে” লিখলাম। কিন্তু “মিস” লিখতে গিয়ে “ম” অক্ষরটা ভুলে গেলাম। মনে করতে পারছিলাম না “ম” কীভাবে লেখে।

হাতে কাঁপুনি শুরু হলো। আমি কি অক্ষর ভুলে যাচ্ছি?

আবার চেষ্টা করলাম। এবার “করছি” লিখতে গিয়ে “র” অক্ষরটা হারিয়ে গেল। যেন আমার ব্রেইন থেকে কেউ একটা একটা করে অক্ষর মুছে দিচ্ছে।

ফোনটা রেখে কাগজ কলম নিয়ে লিখতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু হাতে লিখতেও অক্ষর মনে পড়ছিল না। যেন আমার ছেচল্লিশ বছরের সব পড়াশোনা, সব লেখালেখি একসাথে মাথা থেকে উধাও।

প্যানিক অ্যাটাক শুরু হলো। আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?

ছোটবেলায় যখন প্রথম অক্ষর শিখেছিলাম, কত কষ্ট করে। “অ আ ই ঈ” – মা বসে বসে শেখাতেন। প্রতিটি অক্ষর একটা আলাদা জগত ছিল। “অ” মানে অজগর, “আ” মানে আম।

সেই অক্ষরগুলো আমার সাথে এত বছর ছিল। আমার সব কথা, সব চিন্তা, সব স্বপ্ন এই অক্ষরগুলো দিয়েই প্রকাশ করেছি। আর আজ তারা আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে?

এক ঘণ্টা বসে থাকার পর আস্তে আস্তে অক্ষরগুলো ফিরে এলো। কিন্তু সেই ভয়টা রয়ে গেল। যদি আবার হারিয়ে যায়?

মেসেজটা শেষ পর্যন্ত পাঠাতে পারিনি। কারণ এই অভিজ্ঞতার পর “তোমাকে মিস করছি” কথাটার কোনো মানে রইল না। আমি কি সত্যিই হ্যাপিকে মিস করছি? নাকি এটাও একটা রেডিমেড ফিলিংস যেটা আমি ভাবি আমার?

পরদিন আরাশের খাতায় দেখলাম সে “বাবা” লিখেছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, এই ছেলেটা “বাবা” কার নাম লিখেছে? আমি কি সত্যিই তার বাবা?

হয়তো আমি ভুল মানুষের জীবন যাপন করছি। এবং আমার অবচেতন মন সেটা জানে। তাই আস্তে আস্তে সেই জীবনের অক্ষরগুলো মুছে দিচ্ছে।

অফিসে একটা ইমেইল লিখতে গিয়েও একই সমস্যা। “প্রিয়” শব্দটা লিখতে গিয়ে “প্রি” পর্যন্ত লিখে আটকে গেলাম। “য” অক্ষরটা কোথায়? কেমন দেখতে?

সহকর্মী রহিম দেখে বলল, “কি হয়েছে ভাই? মনে হচ্ছে কিছু ভাবছেন।”

তাকে কি বলব যে আমি অক্ষর ভুলে যাচ্ছি? তাহলে তো আমাকে পাগল ভাববে।

রাতে হ্যাপি বাড়ি ফিরে জিজ্ঞেস করল, “কোনো মেসেজ দাওনি কেন?”

বললাম, “মনে হয়নি।”

কিন্তু ভেতরে জানি, সত্যিকারের কারণ হলো আমি আমার নিজের ভাষা ভুলে যাচ্ছি।

আল্লাহ, আমার সাথে কি হচ্ছে? আমি কি আস্তে আস্তে নিজেকে হারিয়ে ফেলছি? প্রথমে গেল কণ্ঠস্বর, তারপর হাতের লেখা, এখন অক্ষর।

পরবর্তী কী হারাবো? স্মৃতি? পরিচয়? নাকি এই সবই একই জিনিসের বিভিন্ন রূপ?

হয়তো আমি এমন একটা পৃথিবী থেকে আসি যেখানে অন্য অক্ষর, অন্য ভাষা। আর এই পৃথিবীর অক্ষরগুলো আমার জন্য ভাড়া করা। এখন সময় শেষ, তাই ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *