ব্লগ

অমর ছায়া

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ রাতে হ্যাপি আমাকে দেখাল তার বাবার পুরনো ফেসবুক একাউন্ট। তিনি মারা গেছেন তিন বছর হলো, কিন্তু তার প্রোফাইল এখনও আছে। তার শেষ পোস্ট – “আজ নাতনির জন্য মিষ্টি কিনলাম।” মানুষজন এখনও তার ওয়ালে লেখে, “চাচা, আপনাকে মিস করি।”

আমি অবাক হয়ে ভাবলাম – মানুষ মারা যাওয়ার পরও কি বেঁচে থাকে ইন্টারনেটে? তার ডিজিটাল পদচিহ্ন কি তার অমরত্বের নতুন রূপ?

আরাশকে এই কথা বলতেই সে বলল, “বাবা, গুগলে আমার নামে সার্চ দিলে আমার ইউটিউব চ্যানেল, আর্ট প্রোফাইল সব পাওয়া যায়। মানে আমি এখন থেকেই অমর!”

“কিন্তু সেটা কি তুই? নাকি তোর একটা ছায়া?”

আরাশ একটু ভেবে বলল, “হ্যাঁ, এটা তো আমার ছায়া। আমি যেমন, সেটা তো ক্যামেরা ধরতে পারে না।”

আমার ভিতরে একটা অ্যাপ লোড হলো যার নাম “অস্তিত্ব বনাম প্রতিচ্ছবি ভার্সন ৩.৫”।

অফিসে সাইফুলের সাথে কথা বলছিলাম। সে বলল, “ভাই, আমার দাদা মারা যাওয়ার আগে তার সব ছবি, ভিডিও, অডিও রেকর্ডিং ক্লাউডে আপলোড করেছেন। বলেছেন, ‘আমি চলে যাব, কিন্তু আমার স্মৃতি থেকে যাবে।'”

“সেটা কি সত্যিই তিনি?”

“জানি না। তবে আমার ছেলে এখন তার দাদুর গল্প ভিডিওতে দেখে। একটা কানেকশন তো আছে।”

রাতে হ্যাপির সাথে এই নিয়ে আলোচনা করছিলাম। “তোর বাবার ফেসবুক দেখে কেমন লাগে?”

“একটা অদ্ভুত অনুভূতি। মনে হয় উনি এখনও আছেন, আবার মনে হয় শুধু একটা ফাঁকা খোলস।”

“কেন ফাঁকা?”

“কারণ সেই প্রোফাইলে তার শেষ তিন বছরের জীবন নেই। তিনি কী ভাবতেন, কী অনুভব করতেন – সেগুলো নেই। শুধু যা তিনি শেয়ার করতেন, সেটুকুই আছে।”

“তাহলে ডিজিটাল অমরত্ব কতটা আসল?”

“হায়দার, এটা অমরত্ব না। এটা একটা মিউজিয়াম। আমার বাবার কিছু জিনিস সংরক্ষিত আছে, কিন্তু তিনি নিজে নেই।”

পরদিন আরাশকে দেখি সে তার পুরনো ভিডিওগুলো দেখছে। “কী করছিস?”

“বাবা, আমার এক বছর আগের ড্রয়িং দেখছি। মনে হচ্ছে একটা অন্য মানুষ এঁকেছে।”

“কেন?”

“কারণ আমি বদলে গেছি। আমার চিন্তা বদলেছে, দেখার চোখ বদলেছে। কিন্তু ইন্টারনেটে আমার পুরনো ভার্সনটা চিরকাল থেকে যাবে।”

আমি বুঝলাম। আরাশ জীবিত কিন্তু তার ডিজিটাল ভার্সন স্থবির। এটা অমরত্ব নাকি হিমায়ন?

নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলাম। মনে হলো তিনি বলছেন, “আমি তোমাদের আসল অমরত্ব দিয়েছি। সেটা তোমাদের রূহে, তোমাদের আমলে। ডিজিটাল পদচিহ্ন শুধু দুনিয়ার খেলনা।”

আমার বাবার কথা মনে পড়ল। তিনি কোনো সেলফি তোলেননি, কোনো পোস্ট করেননি। কিন্তু তার শেখানো মূল্যবোধ আমার মধ্যে বেঁচে আছে। আমার প্রতিটি সৎ কাজে তিনি বেঁচে আছেন। এটা কি ডিজিটাল পদচিহ্নের চেয়ে গভীর অমরত্ব নয়?

হ্যাপির বাবার ফেসবুক প্রোফাইল তার অতীতকে ধরে রেখেছে। কিন্তু হ্যাপির রান্নায় তার হাতের স্পর্শ, তার শেখানো ভালোবাসা – এগুলো এগিয়ে চলেছে আরাশের মধ্যে, ভবিষ্যতের দিকে।

ডিজিটাল পদচিহ্ন একটা স্ট্যাটিক ইমেজ। কিন্তু আসল অমরত্ব একটা প্রবাহমান নদী। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বয়ে যায়।

আরাশকে বললাম, “তুই যে আর্ট করিস, সেটা তোর ডিজিটাল পদচিহ্ন। কিন্তু তোর আর্টের যে প্রেরণা, সেটা তোর আত্মায়।”

“মানে?”

“মানে, তোর ইউটিউব চ্যানেল একদিন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তুই যে কাউকে আর্ট করতে শেখালি, সেই মানুষটার মধ্য দিয়ে তোর আসল অমরত্ব চলবে।”

আমি বুঝলাম, ডিজিটাল পদচিহ্ন আমাদের ‘কী ছিলাম’ সেটা রাখে। কিন্তু প্রকৃত অমরত্ব ‘কী দিয়ে গেলাম’ তার মধ্যে।

একটা সেলফি আমার মুখের ছবি রাখবে। কিন্তু একটা সৎ কাজ আমার চরিত্রের ছাপ রেখে যাবে কারো হৃদয়ে।

অমর ছায়া নয়, অমর আলো হতে হবে। যে আলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম জ্বালিয়ে রাখে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *