আরাশ এসে বলে, “আব্বু, আমার বন্ধু তাহমিদকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছে।” আমি জিজ্ঞেস করি, “কেন?” সে বলে, “তার আব্বু বলেছেন স্কুলে নাকি বেদ্বীনি শেখায়।”
আমি ভাবি – বেদ্বীনি মানে কী? গণিত? বিজ্ঞান? নাকি প্রশ্ন করা?
সপ্তাহ দুয়েক পরে তাহমিদের সাথে দেখা। আরাশ জিজ্ঞেস করে, “তোমার মাদ্রাসায় কী পড়াও?” তাহমিদ বলে, “আরবি, উর্দু, হাদিস, ফিকাহ।” আরাশ বলে, “আচ্ছা, তোমার মাদ্রাসায় কি ইন্টারনেট আছে?” তাহমিদ বলে, “না, ওইটা শয়তানের জিনিস।”
আমার পেটে মোচড় দেয়।
আমি তাহমিদকে জিজ্ঞেস করি, “তুমি কি জানো মহাকাশে কত গ্রহ আছে?” সে বলে, “এগুলো জানার দরকার নেই। জান্নাত-জাহান্নাম জানলেই হবে।” আরাশ বলে, “কিন্তু আল্লাহ তো আকাশের তারাও বানিয়েছেন। সেগুলো না জানলে আল্লাহর সৃ্টি চেনা হয় না।”
তাহমিদ চুপ হয়ে যায়।
আমি ইউটিউবে “মাদ্রাসা শিক্ষা” লিখে সার্চ করি। একটা ভিডিও দেখি। হুজুর সাহেব বলছেন, “ইংরেজি শিক্ষা মানে ইসলাম ছাড়া।” তার পেছনে বোর্ডে লেখা “গণিত হারাম” এর ফতোয়া। আমি কমেন্ট পড়ি। একজন লিখেছে, “তাহলে হুজুর সাহেব কিভাবে মোবাইল ব্যবহার করেন? মোবাইল তো ইংরেজি বিজ্ঞান দিয়ে তৈরি।”
আমি আরেকটা ভিডিও দেখি। একজন মাদ্রাসা ছাত্র বলছে, “আমি ১৫ বছর মাদ্রাসায় পড়েছি। কিন্তু চাকরির জন্য এসএসসি-এইচএসসির সার্টিফিকেট চায়। আমার কাছে নেই।” ভিডিওর শেষে সে কাঁদে।
আমার গলায় কান্না চেপে আসে।
হ্যাপি বলে, “তুমি কী ভাবছো?” আমি বলি, “তাহমিদদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।” সে বলে, “কেন?” আমি বলি, “দেখো, আজকের যুগে কম্পিউটার না জানলে কোনো কাজ পাওয়া যায় না। ইংরেজি না জানলে কোনো বই পড়া যায় না। বিজ্ঞান না জানলে আধুনিক জীবন বোঝা যায় না।”
হ্যাপি বলে, “তাহলে ধর্ম?”
আমি বলি, “ধর্মও শিখবে, আধুনিক জ্ঞানও শিখবে। আল্লাহ তো সব জ্ঞানের মালিক।”
আরাশ এসে বলে, “আব্বু, আমি তাহমিদকে ইউটিউবে স্পেস ভিডিও দেখাতে চেয়েছিলাম। সে বলেছে তার উস্তাদ নিষেধ করেছেন।” আমি জিজ্ঞেস করি, “কেন?” আরাশ বলে, “উস্তাদ বলেছেন নাসা শয়তানের কাজ করে।”
আমি হতাশ হয়ে যাই।
আমি গুগলে সার্চ করি – “ইসলামী স্বর্ণযুগে বিজ্ঞান।” দেখি হাজার বছর আগে মুসলিম বিজ্ঞানীরা গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব এনেছিলেন। আল-জাবির, ইবনে সিনা, আল-খোয়ারিজমি – এরা সবাই ধর্মপ্রাণ মুসলিম ছিলেন। কিন্তু তারা বিজ্ঞানচর্চাকে ইবাদত মনে করতেন।
আমি ভাবি – তাহলে এখন কী হলো? কেন আমাদের মাদ্রাসাগুলো জ্ঞানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে?
একদিন তাহমিদের আব্বুর সাথে দেখা। তিনি বলেন, “হায়দার ভাই, আপনি আরাশকে স্কুলে পড়ান কেন? মাদ্রাসায় পড়ালে আখিরাতের মুক্তি পাবে।” আমি বলি, “আখিরাতের সাথে দুনিয়ার জ্ঞানের বিরোধ কোথায়?”
তিনি বলেন, “ইংরেজি বিজ্ঞান পড়লে ইমান চলে যায়।”
আমি বলি, “আল্লাহ কি শুধু আরবি জানেন? তিনি তো সব ভাষার স্রষ্টা।”
তিনি রেগে চলে যান।
রাতে আরাশ বলে, “আব্বু, তাহমিদ আজ বলেছে পৃথিবী নাকি সূর্যের চারপাশে ঘোরে না। সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে।” আমি জিজ্ঞেস করি, “তুমি কী বলেছো?” আরাশ বলে, “আমি বলেছি স্যার বিজ্ঞান ক্লাসে অন্যরকম পড়িয়েছেন। তাহমিদ বলেছে স্যার ভুল পড়ান।”
আমি চোখ বন্ধ করি। ভাবি – এই শিশুরা বড় হয়ে কী করবে? যে জ্ঞানের ভিত্তিতে আজকের দুনিয়া চলে, সে জ্ঞান থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে বড় হচ্ছে।
আমি একটা প্রশ্ন করি নিজেকে – আল্লাহ কি চান তার বান্দারা অজ্ঞ থাকুক? নাকি তিনি চান তারা জ্ঞানী হোক?
কোরআনেই তো লেখা – “পড়ো তোমার প্রভুর নামে।”
তাহলে কেন আমাদের মাদ্রাসাগুলো পড়ার বিরুদ্ধে? কেন জ্ঞানের বিরুদ্ধে?
আমার মনে হয় আমাদের ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা একটা বন্ধ কক্ষের মতো। যেখানে আলো ঢোকে না, বাতাস ঢোকে না। শুধু অন্ধকার আর দম বন্ধ করা বাতাস।
আমি আয়নায় মুখ দেখি। প্রশ্ন করি – আমার সন্তানের জন্য কোন পথটা সঠিক?
জবাব এখনো পাই না।
একটু ভাবনা রেখে যান