ব্লগ

অন্ধকারে দূরত্ব

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

রাত তিনটা। হ্যাপি আমার পাশেই শুয়ে। তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে সে আমার থেকে হাজার মাইল দূরে।

বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে থাকার চেয়ে নিঃসঙ্গতার আর কোনো সংজ্ঞা আছে কি?

দিনের বেলা আমরা কথা বলি। হাসি। কিন্তু রাত হলে দুজনেই নিজ নিজ জগতে চলে যাই। হ্যাপি হয়তো ভাবে তার মায়ের কথা, বাবার অসুখের কথা। আমি ভাবি কাল কী লিখব, কীভাবে মাসটা চালাব।

এই অন্ধকারে আমরা দুজনেই একা।

আমার মনে পড়ে বিয়ের প্রথম বছরের কথা। তখনও এক বিছানায় শুলে আমার ভালো লাগত না। এত কাছে একজন মানুষ—এই ব্যাপারটা আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগত। আমি ভাবতাম সময়ের সাথে এই অস্বস্তি কেটে যাবে।

পনেরো বছর পরেও কাটেনি।

আমি কি খুব অদ্ভুত? নাকি বেশিরভাগ স্বামী-স্ত্রীই এভাবে পাশাপাশি শুয়ে নিজ নিজ একাকীত্ব নিয়ে থাকে?

হ্যাপি কখনো কিছু বলে না। কিন্তু আমি জানি সেও বোঝে। কারণ সে কখনো আমার খুব কাছে আসার চেষ্টা করে না। যেন একটা অদৃশ্য সীমানা আছে আমাদের মধ্যে।

কিন্তু দিনের আলোয় এই সীমানা দেখা যায় না। দিনে আমরা একসাথে চা খাই, একসাথে আরাশকে নিয়ে হাসি। রাতে এসে হঠাৎ আবিষ্কার করি—আমরা দুজন আলাদা মানুষ।

আজ রাতে হ্যাপি ঘুমানোর আগে আমার হাতটা ধরেছিল। আমি সেই হাত সরিয়ে নিইনি। কিন্তু আমার শরীরটা শক্ত হয়ে গেছিল। যেন আমি কোনো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছি।

যুদ্ধ? কার সাথে? হ্যাপির সাথে? না। নিজের সাথে।

আমার ভিতরে একটা অংশ চায় হ্যাপিকে জড়িয়ে ধরি। তার কপালে চুমু দিই। বলি যে আমি তাকে ভালোবাসি। কিন্তু আরেকটা অংশ বলে, এগুলো করার দরকার নেই। আমরা তো পাশাপাশি আছি। এইটুকুই যথেষ্ট।

কোন অংশটা ঠিক? যে অংশ চায় কাছে আসতে, নাকি যে অংশ দূরত্ব বজায় রাখতে চায়?

আমি জানি না।

হ্যাপি এখন ঘুমিয়ে গেছে। তার মুখে শান্তির ছাপ। কিন্তু আমি জানি না সে স্বপ্নে কী দেখছে। আমি জানি না তার ভিতরেও এই একই দ্বন্দ্ব আছে কিনা।

আমার মনে হয় আমরা দুজনেই অভিনয় করে চলেছি। দিনের আলোয় অভিনয় করি যে আমরা সুখী দম্পতি। রাতের অন্ধকারে অভিনয় করি যে আমরা একসাথে ঘুমাচ্ছি।

কিন্তু আসলে আমরা দুজনেই একা।

এই একাকীত্ব কি স্বাভাবিক? নাকি এটা আমাদের ব্যর্থতা? আমি কি হ্যাপিকে ভালোবাসতে পারি নাই? নাকি ভালোবাসা দেখানো ভুলে গেছি?

আল্লাহ, এই নিরবতার মানে কী? এই পাশাপাশি শুয়ে থেকেও দূরে থাকার অর্থ কী?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *