ব্লগ

অন্ধকারের রূপ

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ রাতে বিদ্যুৎ চলে গেল। হঠাৎ অন্ধকারে দেখলাম পাশের ফ্ল্যাটের একটা ছোট মেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। তার মা বলছে, “ভয় নেই। আলো এসে যাবে।” মেয়েটা বলছে, “অন্ধকারে ভূত আসে।”

আমি হেসে ফেললাম। কিন্তু হাসতে হাসতেই মনে হলো – আমার এখন অন্ধকারে ভয় লাগে অন্য কারণে। চোর আসতে পারে।

ছোটবেলায় অন্ধকারে ভূতের ভয়। বড় হয়ে অন্ধকারে মানুষের ভয়।

আমার ভিতরে একটা অ্যাপ খুলে গেল যার নাম “ভয়ের রূপান্তর ভার্সন বয়ঃক্রম”।

সকালে বাসে দেখি একটা বাচ্চা ইনজেকশনের ভয়ে কাঁদছে। তার বাবা বলছে, “এটা একটুখানি ব্যথা। সাহস করো।”

আমি ভাবলাম – আমার এখন ইনজেকশনের ভয় নেই। ভয় লাগে হাসপাতালের বিল দেখে। বাচ্চা ভয় পায় সুচের। আমি ভয় পাই টাকার হিসাবের।

পার্কে দেখি একটা ছেলে উঁচু স্লাইড থেকে নামতে ভয় পাচ্ছে। নিচে দাঁড়িয়ে তার মা উৎসাহ দিচ্ছে। “এসো বাবা। কিছু হবে না।”

আমার মনে পড়ল আমিও ছোটবেলায় উঁচু জায়গার ভয় পেতাম। এখন ভয় পাই নিচে নামার। সামাজিক অবস্থান থেকে নিচে নামার।

স্কুলের সামনে দেখি একটা মেয়ে নতুন ক্লাসে যেতে ভয় পাচ্ছে। “আমি কাউকে চিনি না।” তার মা বলছে, “নতুন বন্ধু হবে।”

আমার এখন নতুন জায়গায় যেতে ভয় লাগে অন্য কারণে। লোকে আমার আর্থিক অবস্থা নিয়ে কী ভাববে। বাচ্চা ভয় পায় না চেনার। আমি ভয় পাই বেশি চেনার।

চিকিৎসকের চেম্বারে দেখি একটা ছেলে দাঁতের ডাক্তারকে ভয় পাচ্ছে। “এটা ব্যথা করবে।”

আমি জানি আমার এখন দাঁতের ডাক্তারের ভয় নেই। ভয় হয় রিপোর্টের ফলাফল শুনতে। বাচ্চা ভয় পায় তাৎক্ষণিক ব্যথার। আমি ভয় পাই ভবিষ্যত অসুস্থতার।

রাস্তায় দেখি একটা বাচ্চা কুকুর দেখে ভয় পেয়ে মায়ের পিছনে লুকিয়েছে। মা বলছে, “ওটা কামড়াবে না।”

আমার এখন কুকুরের ভয় নেই। ভয় লাগে মানুষের। যারা হাসিমুখে ক্ষতি করে। বাচ্চা ভয় পায় যা দেখায়। আমি ভয় পাই যা লুকায়।

দোকানে দেখি একটা মেয়ে চকলেট চাইছে। “আম্মা, আমি ওটা খেতে চাই।” মা বলছে, “দাঁত খারাপ হবে।” মেয়ে ভয় পেল, “সত্যি?”

আমার এখন চকলেটের ভয় নেই। ভয় লাগে ডায়াবেটিসের। বাচ্চা ভয় পায় কল্পিত ক্ষতির। আমি ভয় পাই প্রমাণিত ক্ষতির।

ট্রেনে দেখি একটা ছেলে জানালার পাশে বসতে ভয় পাচ্ছে। “পড়ে যাব।” তার বাবা বলছে, “ধরে রাখব।”

আমার এখন জানালার পাশে বসতে ভয় লাগে না। ভয় লাগে জীবনের যাত্রাপথে কেউ ধরে রাখবে কিনা। বাচ্চা ভয় পায় শারীরিক পতনের। আমি ভয় পাই মানসিক পতনের।

বিয়ে বাড়িতে দেখি একটা বাচ্চা মঞ্চে উঠে গান গাইতে ভয় পাচ্ছে। “সবাই দেখবে।” তার নানি বলছে, “তুমি ভালো গাও।”

আমার এখন মঞ্চে উঠতে ভয় লাগে অন্য কারণে। লোকে আমার পোশাক, কথাবার্তা নিয়ে বিচার করবে। বাচ্চা ভয় পায় মনোযোগের। আমি ভয় পাই সমালোচনার।

রাতে একটা মা তার ছেলেকে ঘুম পাড়াচ্ছে। ছেলে বলছে, “খারাপ স্বপ্ন আসবে।” মা বলছে, “আমি পাশে আছি।”

আমার এখন খারাপ স্বপ্নের ভয় নেই। ভয় লাগে ঘুম না আসার। অর্থের চিন্তায়, ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায়। বাচ্চা ভয় পায় কল্পনার দুঃস্বপ্নের। আমি ভয় পাই বাস্তবের দুঃস্বপ্নের।

ব্যাংকে দেখি একটা শিশু টাকা গুনতে ভুল করে ভয় পেয়েছে। “হিসাব ভুল হয়ে গেছে।” তার দাদা বলছে, “আবার করো।”

আমার এখন হিসাব ভুল করার ভয় অনেক বেশি। একটা ভুল মানে হয়তো সারা মাসের খরচ মেটাতে পারব না। বাচ্চা ভয় পায় ভুলের। আমি ভয় পাই ভুলের পরিণতির।

নামাজ পড়ে ভাবছিলাম। ছোটবেলায় আমার ভয়গুলো ছিল সরল। অন্ধকার, উঁচু জায়গা, কুকুর, ইনজেকশন। এগুলো দেখা যায়, ছোঁয়া যায়।

এখন আমার ভয়গুলো অদৃশ্য। দরিদ্রতা, অপমান, একাকীত্ব, ব্যর্থতা, বার্ধক্য, মৃত্যু।

ছোটবেলার ভয় ছিল মুহূর্তের। কান্নাকাটি করলে, মা-বাবার কোলে গেলে কেটে যেত।

এখনকার ভয় চিরস্থায়ী। এগুলো আমাদের ছায়ার মতো সারাজীবন পিছু নেয়।

ছোটবেলায় আমরা ভয় পেতাম যা নেই। বড় হয়ে ভয় পাই যা আছে।

ছোটবেলার ভয় ছিল নির্দোষ। এখনকার ভয় অপরাধী।

কারণ এখন আমরা জানি – আমাদের ভয়ের জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী।

অন্ধকার এখনো একই আছে। শুধু তার ভিতরে লুকিয়ে থাকা জিনিসটা পালটেছে।

ভূতের বদলে এখন লুকিয়ে আছে আমাদের নিজেদের ব্যর্থতা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *