ব্লগ

অন্ধকারের দালিলিক ষড়যন্ত্র

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ মসজিদে জুম্মার নামাযের পর হুজুর সাহেব বললেন, “মেয়েদের বেশি পড়াশোনা করা ঠিক না। তারা ঘরে থেকে সংসার করবে। বাইরের লেখাপড়া তাদের বিগড়ে দেয়।”

আমার কান খাড়া হলো। আরাশকে বলেছি – পড়াশোনা জরুরি। কিন্তু যদি আমার মেয়ে থাকত, তাহলে কি তার জন্য এই কথা প্রযোজ্য হতো না?

নামাযের পর হুজুর সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, “হুজুর, ইসলামে তো জ্ঞানার্জন ফরজ বলা হয়েছে সবার জন্য।”

“ইলিম ফরজ মানে কুরআন-হাদিস শেখা। ইউনিভার্সিটিতে পড়া নয়। মেয়েরা বেশি শিখলে পুরুষদের সাথে তর্ক করে।”

আমি বিস্মিত। হাদিসে আছে, “দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন কর।” এখানে কি লেখা আছে শুধু পুরুষদের জন্য?

বাসায় ফিরে হ্যাপিকে বললাম। হ্যাপি বলল, “আমি তো এইচএসসি পাস করেই তোমাকে বিয়ে করেছি। তারপর আর পড়া হলো না। কিন্তু আফসোস নেই। আরাশকে ভালো মানুষ করে তুলতে পেরেছি।”

“তুমি যদি আরো পড়তে, তাহলে কী হতে?”

“হয়তো ডাক্তার বা শিক্ষক হতে পারতাম। আর্থিক সাহায্যও করতে পারতাম।”

রাতে ইন্টারনেটে খোঁজ নিলাম। দেখলাম ইসলামের ইতিহাসে নারী শিক্ষার উজ্জ্বল নিদর্শন।

আইশা (রা) ছিলেন ফিকহশাস্ত্রের অন্যতম কর্তৃপক্ষ। তার কাছে শত শত পুরুষ সাহাবী জ্ঞানার্জন করেছেন। উম্মে সালামা (রা) থেকে শুরু করে অনেক মহিলা সাহাবী হাদিসের বর্ণনাকারী।

রসুল (সা) এর যুগে ‘দার আল-আরকাম’ এ নারী-পুরুষ একসাথে শিক্ষা নিতেন। কোনো বিধিনিষেধ ছিল না।

আরো পড়লাম, ফাতিমা আল-ফিহরি নামে এক মুসলিম নারী পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ‘আল-কারাউইন’ প্রতিষ্ঠা করেন ৮৫৯ সালে। তিনি শিক্ষাবিদ, দার্শনিক এবং ধর্মবিদ ছিলেন।

তাহলে আজকে কেন বলা হয় নারীরা বেশি শিখলে ‘বিগড়ে যায়’?

আমি ভাবি, যারা মেয়েদের শিক্ষার বিরোধিতা করেন, তারা আসলে কী ভয় পান? ভয় পান যে শিক্ষিত নারী তাদের অযৌক্তিক কর্তৃত্ব মানবে না? যে সে নিজের অধিকার চিনবে?

আরাশ পড়ার টেবিলে বসে গণিতের অঙ্ক করছে। তাকে দেখে মনে হয় – এই ব্রেইন যদি একটি মেয়ের হতো, তাহলে কি সেটা অপচয় করতে হতো?

মনে পড়ে আল্লামা ইকবালের মায়ের কথা। ইমাম বিবি। উনি অত্যন্ত শিক্ষিত ছিলেন। ইকবাল বলতেন, “আমার মা-ই আমার প্রথম শিক্ষক।” শিক্ষিত মায়ের কারণেই ইকবালের মতো দার্শনিক জন্মেছিলেন।

কুরআনে আছে, “তোমার প্রতিপালক তোমাদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তোমাদের মধ্যে কেউ – পুরুষ বা নারী – সৎকর্ম করলে এবং সে বিশ্বাসী হলে, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করবো।”

এখানে জ্ঞানার্জন ও সৎকর্মে কি নারী-পুরুষের ভেদাভেদ আছে?

হাদিসে আছে, “জ্ঞানী ব্যক্তির কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র।” এখানে কি বলা আছে শুধু পুরুষের কলম?

বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবি। আমি যদি আমার অজ্ঞতার কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নিই, হ্যাপি শিক্ষিত হলে আমাকে সংশোধন করতে পারত। পরিবারের কল্যাণ বাড়ত।

আজকে যেসব দেশে নারী শিক্ষার হার বেশি – জাপান, জার্মানি, নরডিক দেশগুলো – সেখানে কি পারিবারিক বন্ধন কম? নাকি আরো শক্তিশালী?

আমার মনে হয়, যারা মেয়েদের শিক্ষার বিরোধিতা করেন, তারা আসলে ইসলামের সেবা করেন না। তারা নিজেদের পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য রক্ষা করার জন্য ধর্মকে অজুহাত বানান।

আল্লাহ কি চান অর্ধেক উম্মত অন্ধকারে থাকুক? নাকি চান সবাই আলোর পথে এগিয়ে চলুক?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *