
সকাল সাতটায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
নীল শার্ট? সাদা? চেক প্যাটার্ন?
প্রশ্নটা আসলে অন্য — কোনটায় তারা আমাকে ভালো দেখবে?
“বাবা, তুমি রোজ এত সময় নাও কেন?” দরজায় আরাশ। স্কুলে যাওয়ার তাড়া।
আমি হাসলাম। “বাবা একটু বুড়ো হয়ে গেছে। সুন্দর হতে সময় লাগে।”
আরাশ চলে গেল। আমি আবার আয়নায় তাকালাম। সাদা শার্টটা পরলাম। নিরাপদ। কেউ কিছু বলবে না।
দপ্তরে ঢুকতেই মিতু বলল, “আজ ভালো লাগছে।”
আমার মনটা ভালো হয়ে গেল। দিনটা ভালো যাবে। কারো কাছে ভালো লাগা মানে দিনটা ভালো।
টেবিলে বসে চিঠি পড়ছি। তখন বস এসে ঢুকলেন। “ঐ রিপোর্টটা কী হলো?”
আমি তাকালাম তার মুখের দিকে। ভুরু কুঁচকানো? নাকি স্বাভাবিক? রাগ করছেন? নাকি শুধু জিজ্ঞেস করছেন?
“আজ দুপুরের মধ্যে দিয়ে দেবো।”
“হুম।” তিনি বেরিয়ে গেলেন।
‘হুম’ মানে কী? সন্তুষ্ট? অসন্তুষ্ট? আমি পাঁচ মিনিট ধরে ভাবলাম এই ‘হুম’ এর মানে।
দুপুরে খাওয়ার সময় সবাই গল্প করছে। হাসছে। আমি লক্ষ্য করছি — কেউ কি আমার দিকে অন্যরকম তাকাচ্ছে? হাসিটা কি আমাকে নিয়ে?
“আপনি কী বলেন?” রিফাত জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, মানে, ঠিক আছে।” আমি জানি না কিসের উত্তর দিলাম। মন ছিল অন্যদের মুখের ভাব পড়তে।
বাসায় ফিরে হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “কেমন গেল?”
“ভালো। মানে, মনে হয় ভালো।”
“মনে হয়?”
“মানে, কিছু বলেননি তো। তাহলে তো ভালোই।”
হ্যাপি চা বানাতে বানাতে বলল, “তুমি জানো, তোমার এই অভ্যাসটা আমার ভালো লাগে না।”
“কোনটা?”
“সবসময় অন্যরা কী ভাবছে সেটা নিয়ে চিন্তা করা। নিজে কী ভাবছো, সেটা তো ভাবো না।”
আমি কিছু বললাম না। বলার কিছু ছিল না।
সেই রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম — এই অভ্যাসটা কবে থেকে?
মনে পড়ল ক্লাস সেভেনের একটা দিন। স্কুলে নতুন ব্যাগ নিয়ে গিয়েছিলাম। বাবা কিনে দিয়েছিল। নীল রঙের।
ক্লাসে ঢুকতেই শামীম বলেছিল, “তোর ব্যাগ দেখতে মেয়েদের মতো।”
সবাই হেসেছিল। আমি হাসিনি।
সেই রাতে বাসায় ব্যাগটা লুকিয়ে রেখেছিলাম। পরের দিন পুরনো ব্যাগ নিয়ে গিয়েছিলাম।
বাবা জিজ্ঞেস করেছিল, “নতুন ব্যাগ নিলি না কেন?”
“ওটা ভালো না।”
“কেন? তোকে তো পছন্দ হয়েছিল দোকানে।”
“আর পছন্দ না।”
মিথ্যা বলেছিলাম সেদিন। আসলে ব্যাগ পছন্দ ছিল। কিন্তু অন্যরা পছন্দ করেনি। তাই নিজের পছন্দটা লুকিয়ে ফেলেছিলাম।
কলেজে তানিয়া নামে এক মেয়েকে ভালো লাগত। কথা বলতে ইচ্ছা করত। কিন্তু সাহস হতো না।
ভাবতাম — আমাকে কেমন লাগবে তার? আমি কি যথেষ্ট স্মার্ট? যথেষ্ট মজার?
বন্ধু হাসান বলেছিল, “বলে ফেল না। কী হবে সবচেয়ে খারাপ? না বলবে। তাতে কী?”
“সবার সামনে?”
“তো? তোর জীবন শেষ হয়ে যাবে?”
কিন্তু আমার কাছে মনে হতো হ্যাঁ, শেষ হয়ে যাবে।
বলিনি শেষমেশ। তানিয়া অন্য কাউকে বিয়ে করেছে। আমি বিয়ে করেছি হ্যাপিকে। পরিবার ঠিক করে দিয়েছিল। নিরাপদ। কেউ না বলার সুযোগ ছিল না।
চাকরি পাওয়ার পর প্রথম দিন সবার সাথে পরিচয় হয়েছিল। বাসায় ফিরে হ্যাপিকে বলেছিলাম, “মনে হয় সবার ভালো লেগেছি।”
“তোমার কেমন লাগলো তারা?”
আমি থমকে গিয়েছিলাম। ভাবিইনি তো।
গতকাল আরাশ জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবা, আমার চুলটা কেমন লাগছে?”
“তোমার নিজের কেমন লাগছে?”
আরাশ অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। “মানে?”
“তোমার নিজের ভালো লাগছে কিনা?”
“আমি জানি না। ক্লাসের সবাই কী বলবে সেটা জানতে চাই।”
আমি কিছু বললাম না। কারণ আমিও তো একই।
হ্যাপি একদিন বলেছিল, “তুমি জানো, তোমার এই সমস্যাটা আমার নেই।”
“কেন?”
“কারণ আমি ছোটবেলা থেকেই জানি, সবাইকে খুশি রাখা যায় না। আমি যা-ই করি, কেউ না কেউ কিছু না কিছু বলবেই।”
“এত সহজ?”
“না, সহজ না।”
হ্যাপি তখন একটা গল্প বলেছিল। ভার্সিটিতে একবার সবাই মিলে ঘুরতে যাচ্ছিল। হ্যাপি যেতে চায়নি।
সবাই বলেছিল, “কেন যাচ্ছো না? সবাই যাচ্ছে!”
হ্যাপি বলেছিল, “আমার যেতে ইচ্ছা নেই।”
“কিন্তু সবাই ভাববে তুমি অদ্ভুত!”
“ভাবুক।”
হ্যাপি যায়নি। সবাই কথা বলেছিল। কিন্তু দুই সপ্তাহ পর সবাই ভুলে গিয়েছিল। আর হ্যাপি সেই সপ্তাহান্তে বাসায় থেকে ঠাকুমার সাথে সময় কাটিয়েছিল।
“তুমি দুঃখ পাওনি?” আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম।
“না। আমি যা চেয়েছিলাম তাই করেছি।”
আমি ভাবছিলাম — কতটা সাহস লাগে এরকম থাকতে?
গত সপ্তাহে একটা বড় কাজ ছিল। শেষে মনে হয়েছিল খুব খারাপ হয়েছে। বসের মুখ দেখে মনে হয়েছিল তিনি রাগ করেছেন।
পরের দিন ডেকে বললেন, “ভালো হয়েছিল। আমরা পেয়েছি।”
আমি অবাক। “কিন্তু আপনার মুখভাব…”
“আমার মাথা ব্যথা ছিল। তাতে কি? কাজ তো ভালো হয়েছে।”
আমি বুঝলাম — আমি কতটা ভুল পড়ছিলাম সবসময়।
সেই রাতে শামীমের সাথে কথা হচ্ছিল।
শামীম বলল, “ভাই, জানিস, আমি আর কারো জন্য অপেক্ষা করি না। আমার যা ভালো লাগে, তাই করি।”
“কীভাবে শুরু করেছিলি?”
“একদিন বুঝেছিলাম — সবাইকে খুশি রাখা যায় না। একজনের কাছে যা ভালো, আরেকজনের কাছে খারাপ।”
“কিন্তু ভয় হয় না? লোকে কী বলবে?”
“প্রথম প্রথম হতো। এখন আর না।”
কথা শেষে আমি ভাবছিলাम — আমি কি পারব?
পরের দিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। আবার নীল-সাদা-চেক এর দ্বন্দ্ব।
হঠাৎ মনে হলো — আজ হলুদ শার্ট পরবো। হলুদ। যেটা আমার পছন্দ কিন্তু কখনো পরি না।
হলুদ শার্ট পরলাম। আয়নায় দেখলাম। ভালো লাগছে। আমার নিজের ভালো লাগছে।
দপ্তরে ঢুকতেই মিতু বলল, “আজ অন্যরকম লাগছে।”
আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো — অন্যরকম মানে খারাপ? ভালো?
তারপর বললাম, “ধন্যবাদ।” আর ভাবলাম না।
টেবিলে বসে কাজ করছি। বস এসে ঢুকলেন। তাকালেন আমার দিকে। আমি তার মুখভাব পড়তে চেষ্টা করলাম। তারপর চেষ্টা বন্ধ করলাম।
“কিছু বলবেন?”
“না, কাগজটা দিতে এসেছিলাম। নাও।”
তিনি বেরিয়ে গেলেন। আমি এবারে পাঁচ মিনিট ভাবলাম না।
অদ্ভুত অনুভূতি।
বাসায় ফিরে হ্যাপিকে বললাম, “আজ হলুদ শার্ট পরেছিলাম।”
হ্যাপি হাসল। “দেখেছি। ভালো লেগেছিল।”
“তোমার?”
“না, তোমার। তোমার মুখ দেখে বুঝেছি।”
আরাশ খেলা থেকে ফিরে বলল, “বাবা, আজ গোল দিয়েছি!”
“সবাই কী বলল?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। তারপর শুধরে নিলাম। “মানে, তোমার কেমন লাগলো?”
আরাশ একটু ভাবল। “আমার খুব ভালো লেগেছে!”
আমি ছেলেকে জড়িয়ে ধরলাম।
সেই রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আয়নায় তাকালাম। নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কেমন আছো?”
অন্যরা কী ভাবছে, সেটা জিজ্ঞেস করলাম না।
পরদিন সকাল। আবার আয়নার সামনে। আবার দ্বন্দ্ব। নীল না সাদা?
আজ কোনটা পরব জানি না। কিন্তু জানি যে প্রশ্নটা অন্য হওয়া উচিত।
উচিত। কিন্তু হয় না সবসময়।
তিরিশ বছরের অভ্যাস এক দিনে যায় না।
হয়তো আজও সাদা পরব। নিরাপদ।
হয়তো আবার হলুদ পরার সাহস হবে না সপ্তাহখানেক।
কিন্তু গতকাল পেরেছিলাম। একদিন।
সেটুকুই।
একটু ভাবনা রেখে যান