আজ রাতে স্বপ্ন দেখলাম—আমি একজন সফল ব্যবসায়ী। বড় অফিস, দামি গাড়ি, অনেক টাকা। কিন্তু আরাশ নেই। হ্যাপিও নেই। আমি একা।
ঘুম ভেঙে গেল। পাশে হ্যাপি শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। আরাশ তার ঘরে। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
কিন্তু একটা প্রশ্ন মনে এলো—ঐ স্বপ্নের আমি কি কোথাও বাস্তব? কোনো সমান্তরাল জগতে?
বিজ্ঞানীরা বলেন—অসংখ্য মাত্রা আছে। প্রতিটি সিদ্ধান্তের সাথে সাথে জগৎ ভাগ হয়ে যায়। একটায় আমি এক সিদ্ধান্ত নিই, অন্যটায় অন্য সিদ্ধান্ত।
তাহলে কোথাও না কোথাও এমন একটা পৃথিবী আছে যেখানে আমি হ্যাপিকে প্রপোজ করিনি? যেখানে আমি অন্য কাউকে বিয়ে করেছি? বা একেবারেই বিয়ে করিনি?
কোথাও হয়তো এমন হায়দার আছে যে কখনো চাকরি হারায়নি। যে আত্মবিশ্বাসী, সফল, নিরাপদ।
আবার কোথাও হয়তো এমন হায়দার আছে যে আরো বেশি কষ্টে আছে। যার আরাশ নেই। যার হ্যাপি নেই।
সকালে হ্যাপিকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি মনে করো অন্য কোনো জগতে আমরা আছি?”
“কেমন জগত?”
“যেখানে আমাদের ভিন্ন জীবন। হয়তো আমরা কখনো দেখা হইনি। হয়তো তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করেছো।”
হ্যাপি একটু ভাবল। “থাকতে পারে। কিন্তু সেটা নিয়ে ভেবে কী লাভ?”
“জানি না। কৌতূহল।”
আমি সত্যিই কৌতূহলী। অন্য মাত্রার হায়দারেরা কেমন? তারা কি সুখী? তারা কি আমার মতো প্রশ্ন করে?
আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি ভাবো অন্য কোনো জগতে তোমার আরেকজন আরাশ আছে?”
আরাশ উত্সাহিত হয়ে বলল, “হয়তো! হয়তো সে আমার চেয়ে ভালো ছাত্র। হয়তো সে আমার চেয়ে ফুটবল ভালো খেলে।”
“তুমি কি তার সাথে দেখা করতে চাইবে?”
আরাশ ভাবল। “জানি না। হয়তো সে আমার চেয়ে ভালো। তাহলে আমার খারাপ লাগবে।”
আমি অবাক হলাম। এগারো বছরের ছেলে এত গভীর করে ভাবে?
দুপুরে একা বসে ভাবলাম—যদি সত্যিই অসংখ্য সমান্তরাল জীবন থাকে, তাহলে কোনটা ‘আসল’ আমি?
হয়তো সব আমিই আসল। প্রতিটি মাত্রায় আমি আমার সিদ্ধান্তের ফলাফল ভোগ করছি।
কোথাও আমি ডাক্তার। কোথাও ইঞ্জিনিয়ার। কোথাও লেখক। কোথাও বেকার।
কিন্তু প্রতিটি আমিই কি এই একই প্রশ্ন করছে—”আমি কি সঠিক পথে?”
হয়তো ঐ সফল ব্যবসায়ী হায়দার ভাবছে—”আমার কি পরিবার থাকা উচিত ছিল?”
আর ঐ একা হায়দার ভাবছে—”আমি কি সব ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি?”
তাহলে কি কোনো হায়দারই সন্তুষ্ট নয়?
সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে তারা দেখছিলাম। ভাবলাম—এই তারাগুলোর আলো হয়তো অন্য মাত্রা থেকে আসছে। হয়তো অন্য হায়দাররাও এই একই তারা দেখছে।
হয়তো কোনো এক মাত্রায় আমার বাবা এখনো বেঁচে আছেন। আমরা একসাথে চা খাই। তিনি আমাকে জীবনের পরামর্শ দেন।
হয়তো কোনো এক মাত্রায় আমার আরো ছেলেমেয়ে আছে। বড় পরিবার। বেশি হাসিখুশি।
কিন্তু তারপর ভাবলাম—আমি কি সেই জীবনগুলো চাই?
ঐ সফল হায়দারের জীবনে আরাশের হাসি নেই। হ্যাপির ভালোবাসা নেই। রাতে একা বিছানায় শুয়ে থাকার একাকীত্ব আছে।
ঐ ধনী হায়দারের কাছে টাকা আছে। কিন্তু তার কি এই মুহূর্তের মতো শান্তি আছে? আমার মতো সন্তুষ্টি আছে?
আমি বুঝলাম—সমান্তরাল জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো এটা: প্রতিটি জীবনেই কিছু হারানো, কিছু পাওয়া আছে।
হয়তো আমি চাকরি হারিয়েছি। কিন্তু আমি পেয়েছি নিজেকে খোঁজার সময়। লেখালেখির আনন্দ। পরিবারের কাছাকাছি থাকার সুযোগ।
রাতে হ্যাপি আর আরাশকে জড়িয়ে ধরলাম। “কী হলো?” হ্যাপি জিজ্ঞেস করল।
“কিছু না। শুধু ভাবছিলাম—আমি ভাগ্যবান।”
“কেন?”
“কারণ অসংখ্য সম্ভাবনার মধ্যে থেকে আমি এই জীবনটা পেয়েছি। তোমাদের পেয়েছি।”
হ্যাপি হেসে বলল, “তুমি আজ আবেগপ্রবণ।”
কিন্তু আমি সত্যি কথাই বলেছি। অন্য সব সমান্তরাল জীবনের চেয়ে এই জীবনটাই আমার পছন্দ।
এখানে আমার সমস্যা আছে। কিন্তু আমার ভালোবাসাও আছে।
এখানে আমার অর্থনৈতিক অভাব আছে। কিন্তু আমার আবেগিক সমৃদ্ধি আছে।
এখানে আমার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। কিন্তু আমার বর্তমান অর্থপূর্ণ।
আর এটাই হয়তো জীবনের আসল সত্য—আমরা যে জীবন পেয়েছি, সেটাকেই সর্বোচ্চ করে তোলা।
কারণ অন্য সব সমান্তরাল জীবন শুধু কল্পনা। একমাত্র এই জীবনটাই আমার হাতে।
আর এই জীবনটাই আমার আসল জীবন।
একটু ভাবনা রেখে যান