সকাল থেকে আমি আর হ্যাপি কথা বলিনি। গতকালের ঝগড়ার রেশ এখনও বাতাসে ভাসছে। আমরা দুজনেই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত থাকার ভান করছি।
আরাশ স্কুল থেকে ফিরে এল।
“বাবা, তুমি আর মা কেন কথা বলছ না?”
আমার শ্বাস আটকে গেল। এগারো বছরের একটা ছেলে কীভাবে এত সূক্ষ্ম জিনিস বুঝতে পারে?
“কে বলেছে আমরা কথা বলছি না?”
“মা তোমাকে চা দিল না আজ। তুমিও মার সাথে হাসিনি।”
আমি আরাশের দিকে তাকালাম। তার চোখে একটা ভয়। যেন সে জানতে চায়, তার বাবা-মায়ের মধ্যে যা হচ্ছে, সেটা কি তার জন্য বিপজ্জনক।
“আমরা একটু রাগ করেছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“কেন রাগ করেছ?”
আমি কী বলব? যে আমি হ্যাপিকে বলেছিলাম সে বেশি খরচ করে? যে হ্যাপি আমাকে বলেছিল আমি কোনো দায়িত্ব নিই না? যে আমরা দুজনেই চিৎকার-চেঁচামেচি করেছি?
“বড়দের কখনো কখনো মতানৈক্য হয়।”
“মতানৈক্য মানে কি রাগারাগি?”
আরাশের এই প্রশ্নে আমার মুখ শুকিয়ে গেল।
না, মতানৈক্য মানে রাগারাগি নয়। মতানৈক্য মানে শান্তিপূর্ণভাবে কথা বলে সমাধান করা। কিন্তু আমরা সেটা পারি না। আমরা চিৎকার করি, দোষারোপ করি, দেয়ালে ঘুঁষি মারি।
“না, রাগারাগি ঠিক নয়।”
“তাহলে তুমি আর মা কেন রাগারাগি করলে?”
আমি আরাশের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু আমার কোনো উত্তর নেই। আমি একজন বাবা, যার কাছ থেকে সন্তান জীবনের শিক্ষা নেয়। কিন্তু আমি নিজেই জানি না কীভাবে সভ্যভাবে দ্বিমত পোষণ করতে হয়।
আমি যখন ছোট ছিলাম, আমার বাবা-মাও ঝগড়া করতেন। আমি তখন ভয় পেতাম। ভাবতাম তাঁরা হয়তো আলাদা হয়ে যাবেন। আজ আমি বুঝতে পারছি, আরাশও একই ভয় পাচ্ছে।
“আরাশ, আমি আর তোমার মা একে অপরকে ভালোবাসি। কখনো কখনো আমাদের মধ্যে মতের পার্থক্য হয়। কিন্তু সেজন্য আমরা আলাদা হয়ে যাব না।”
“আলাদা মানে?”
“আলাদা মানে… আলাদা বাড়িতে থাকা।”
আরাশের চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল। “তুমি চলে যাবে?”
“না, আমি কোথাও যাব না। আমি তোমার বাবা, তোমার মায়ের স্বামী। আমরা একসাথেই থাকব।”
কিন্তু আরাশের মুখে স্বস্তি ফিরে এল না। সে জানতে চাইল, “তাহলে কেন তুমরা এত জোরে কথা বলেছিলে গতকাল?”
আমি বুঝলাম, আরাশ সব শুনেছে। আমাদের গোপন মনে করা সব কথা।
এই মুহূর্তে আমার মনে হল, আমি একটা খারাপ বাবা। আমার ছেলে আমাকে দেখে শিখছে যে, প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যার সমাধান হচ্ছে চিৎকার করা।
“আরাশ, আমরা ভুল করেছি। জোরে কথা বলা ঠিক হয়নি। আমরা আর এমন করব না।”
কিন্তু আরাশ জানে এটা মিথ্যা। কারণ আমরা আগেও এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।
আমি হ্যাপিকে ডাকলাম। আমরা দুজনে আরাশকে নিয়ে বসলাম।
“আরাশ, আমরা তোমার কাছে দুঃখিত। আমাদের ঝগড়া শোনার জন্য তুমি কষ্ট পেয়েছ।”
আরাশ বলল, “আমার বন্ধু রাহুলের বাবা-মা আলাদা হয়ে গেছে। তার বাবা এখন আর বাড়িতে আসেন না।”
আমার বুক মুচড়ে উঠল। আরাশের মনে আমাদের নিয়ে এই ভয়।
সেদিন আমি আর হ্যাপি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা কখনো আরাশের সামনে ঝগড়া করব না। কিন্তু আমরা জানি, এই প্রতিশ্রুতি রাখা কত কঠিন।
বাচ্চারা কি জানে তাদের বাবা-মা আসলে কতটা অসহায়?
একটু ভাবনা রেখে যান