ব্লগ

অনুবাদের ভুলভুলাইয়া

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

কাল অফিসে একটা ইংরেজি ইমেইলের অনুবাদ করতে দিয়েছিল সাহেব। বিদেশি ক্লায়েন্টের কাছে পাঠানো হবে। ইংরেজিতে লিখতে হবে আমাদের কোম্পানির পরিচয়।

“আমরা একটি পারিবারিক প্রতিষ্ঠান” – এই কথাটা ইংরেজিতে কী হবে?

“We are a family business” – এই লিখলাম।

কিন্তু লিখে দেখি, আসল কথাটা কোথায় গেল? “পারিবারিক প্রতিষ্ঠান” মানে শুধু “family business” নয়। এর মধ্যে আছে আবেগ, ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা, কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্য।

কিন্তু ইংরেজিতে সেসব কোথায়?

“আমাদের গ্রাহকরা আমাদের পরিবারের মতো” – এটা কী করে ইংরেজিতে বলব?

“Our customers are like our family” – শুনতে তো অদ্ভুত লাগছে। বিদেশি ভাববে আমরা পাগল।

তিন ঘণ্টা ধরে বসে রইলাম। প্রতিটি বাংলা বাক্য ইংরেজিতে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করছি। কিন্তু দেখছি আসল ভাবটা হারিয়ে যাচ্ছে।

“আমরা আন্তরিকভাবে সেবা দিই” – Sincerely serve? Heartfelt service? কোনোটাই ঠিক লাগছে না।

ছোটবেলায় ইংরেজি ক্লাসে স্যার বলতেন, “অনুবাদ মানে শুধু ভাষা বদলানো নয়। ভাব বদলানো।”

তখন বুঝতাম না। আজ বুঝি।

“মায়ের হাতের রান্না” – এটা ইংরেজিতে কী? “Mother’s hand-cooked food”? “Home-cooked meal”? কিন্তু “মায়ের হাতের” যে আবেগ, সেটা কোথায়?

বাংলায় যখন বলি “মায়ের হাতের রান্না”, তখন স্বাদের সাথে সাথে ভালোবাসা, যত্ন, আদর – সব কিছু মিশে যায়। কিন্তু ইংরেজিতে শুধু খাবারের কথা থাকে।

দুপুরে হ্যাপি ফোন করে জিজ্ঞেস করল, “কী করছ?”

বললাম, “অনুবাদ করছি।”

সে বলল, “কঠিন?”

বলতে চাইলাম, “কঠিন নয়, অসম্ভব।” কিন্তু বললাম, “একটু।”

এই যে আমি হ্যাপির সাথেও সত্যিকারের কথা বলতে পারলাম না, এটাও কি একধরনের ভুল অনুবাদ নয়?

আমার মনের ভাব আমার মুখের ভাষায় আসতে আসতে বদলে যায়। তারপর অন্যের কানে পৌঁছাতে আরো বদলায়।

সন্ধ্যায় আরাশকে পড়তে দেখে বললাম, “ভালো ছেলে।”

কিন্তু আসলে বলতে চেয়েছিলাম, “তুমি আমার গর্ব, আমার স্বপ্ন, আমার ভবিষ্যৎ।”

আরাশ “ভালো ছেলে” শুনল। কিন্তু আমার হৃদয়ের পূর্ণ বার্তা তার কাছে পৌঁছাল না।

রাতে ইমেইলটা শেষ করলাম। কিন্তু পড়ে দেখি, এটা আমাদের কোম্পানির পরিচয় নয়। এটা একটা যান্ত্রিক বিবৃতি। আত্মা নেই, প্রাণ নেই।

যে কোম্পানিতে আমরা সবাই পরিবারের মতো, যেখানে প্রতিটি কাজে ভালোবাসা মিশে থাকে, সেই কোম্পানি হারিয়ে গেছে অনুবাদে।

আল্লাহ, এই কি আমার জীবনের সমস্যা? আমি প্রতিদিন অনুবাদ করি। মনের ভাব অনুবাদ করি কথায়। কথা অনুবাদ করি কাজে। কাজ অনুবাদ করি ফলাফলে।

কিন্তু প্রতিটি অনুবাদে মূল ভাব হারিয়ে যায়।

হয়তো এটাই জীবনের নিয়ম। আমরা যা অনুভব করি, তা পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারি না। সবটাই অসম্পূর্ণ অনুবাদ।

তবে সেই অসম্পূর্ণতার মধ্যেই হয়তো সৌন্দর্য।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *