ব্লগ

অনুবাদের ফাঁকে

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

ইংরেজি ক্লায়েন্টকে ইমেইল লিখছি। “আমি দুঃখিত” লিখতে গিয়ে “I am sorry” লিখলাম। কিন্তু এই দুটো কি একই জিনিস? বাংলার “দুঃখিত” এ যে গভীরতা, সেটা কি “sorry” তে আছে?

অনুবাদে হারিয়ে যায় আবেগের রং।

আরাশকে ইংরেজিতে “I love you” শেখাচ্ছি। সে বলল, “এটা ‘ভালোবাসি’ এর মতো?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” কিন্তু মিথ্যা বললাম। “ভালোবাসি” শব্দে যে উষ্ণতা, যে গভীরতা, সেটা “love” এ নেই।

প্রতিটি ভাষার নিজস্ব আত্মা আছে।

মায়ের কবরে গিয়ে মনে মনে বলি, “মা।” এই একটা শব্দে কত কিছু। আদর, নিরাপত্তা, ভালোবাসা, হারানোর বেদনা। ইংরেজিতে “Mother” বললে কি সেই অনুভূতি আসে?

অনুবাদ শব্দ পারে। অনুভূতি পারে না।

স্ত্রীর সাথে রাগ করে বাইরে বেরিয়েছিলাম। রাতে ফিরে বললাম, “মাফ করো।” শুধু “মাফ করো” নয়—গলার স্বর, চোখের ভাব, হাতের অঙ্গভঙ্গি, সব মিলে একটা সম্পূর্ণ অনুভূতি। এটা কীভাবে অনুবাদ করব?

ভাষার সাথে সংস্কৃতি জড়িত। সংস্কৃতির সাথে আবেগ।

জাপানি ভাষায় “ikigai” শব্দ আছে। মানে জীবনের উদ্দেশ্য, বেঁচে থাকার কারণ। ইংরেজিতে এর কোনো সমতুল্য নেই। বাংলাতেও নেই। কিছু আবেগ কিছু ভাষার বন্দি।

অফিসে বিদেশি বসের সাথে কথা বলি। আমার মনের কথা ইংরেজিতে বলতে গিয়ে অনেক কিছু বাদ পড়ে। যেটা মাতৃভাষায় সহজ, সেটা দ্বিতীয় ভাষায় কঠিন।

কবিতা অনুবাদ করলে কবিতা থাকে না। থাকে ছন্দহীন গদ্য। কারণ কবিতার আত্মা ভাষার ভিতরে লুকানো।

আমার দাদা বলতেন, “মনের ভাব প্রাণের কথা।” এই লাইন ইংরেজিতে বললে—”Feelings of heart, words of soul.” শুনতে কেমন লাগছে? আসল কবিতা কোথায় গেল?

অনুবাদে শুধু অর্থ যায় না, মিউজিক যায়। প্রতিটি ভাষার নিজস্ব সুর আছে।

“আমার সোনার বাংলা” গানের ইংরেজি অনুবাদ “My Golden Bengal”। কিন্তু “সোনার বাংলা” আর “Golden Bengal” কি একই অনুভূতি দেয়? “সোনার” শব্দে যে আবেগ, সেটা “Golden” এ নেই।

হিন্দি সিনেমার “মা” ডাক। উর্দুর “আম্মি”। ইংরেজির “Mom”। সব মাকেই ডাকে। কিন্তু প্রতিটির স্বাদ আলাদা।

বিয়ের পর স্ত্রী প্রথমবার “আপনি” বলা বন্ধ করে “তুমি” বলল। সেই পরিবর্তনে কত আবেগ! ইংরেজিতে সব “you”। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য কোথায় গেল?

ছোটবেলায় মা বলতেন, “খোকা।” এই “খোকা” শব্দে যে আদর, সেটা “Son” বললে আসে না।

অনুবাদক সবচেয়ে কষ্টের পেশা। শব্দ পারে, কিন্তু আত্মা পারে না।

প্রেমিক যখন প্রেমিকাকে “তুই” বলে, সেটা আদর। কিন্তু ইংরেজিতে “you” বললে সেই আদর বোঝা যায় না। প্রসঙ্গ দেখতে হয়।

সবচেয়ে বড় অনুবাদের সমস্যা—নিজের মনের কথা নিজেই অনুবাদ করতে পারি না। আমি বাংলায় ভাবি, ইংরেজিতে বলি। মাঝখানে হারিয়ে যায় অনেক কিছু।

হয়তো এই জন্যই মাতৃভাষা এত গুরুত্বপূর্ণ। এই ভাষায় আমার আবেগ সম্পূর্ণ। অন্য ভাষায় অসম্পূর্ণ।

কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে তো অনুবাদ ছাড়া উপায় নেই। তাহলে আবেগ হারিয়ে যাবে? নাকি নতুন আবেগ তৈরি হবে?

হয়তো অনুবাদে যা হারায়, সেটাই নতুন শিল্প।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *