ব্লগ

যে অনুমতিপত্র নিতে আরও অনুমতিপত্রের দরকার

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আরাশের স্কুলের একটা কাজে গিয়ে জানলাম তার একটা অনুমতিপত্র লাগবে। খুব সাধারণ একটা কাগজ। কিন্তু সেই কাগজ নিতে গিয়ে দেখি আরও তিনটা অনুমতিপত্র লাগবে। আর সেই তিনটা অনুমতিপত্র নিতে লাগবে আরও নয়টা। এভাবে চলতে থাকলে আরাশ বুড়ো হয়ে যাবে, কিন্তু কাগজ হবে না।

প্রথমে ভেবেছিলাম খুব সহজ ব্যাপার। আরাশের জন্মসনদের একটা কপি চাই। গেলাম জন্ম নিবন্ধন অফিসে। কেরানি বলল, “জন্মসনদের কপি পেতে হলে আগে আপনার পরিচয় প্রমাণ করতে হবে।”

আমি জাতীয় পরিচয়পত্র দিলাম। সে বলল, “এটা চলবে না। আপনাকে আগে ‘পরিচয় সত্যায়ন’ করাতে হবে।”

পরিচয় সত্যায়ন করতে গেলাম। সেখানে বলল, “পরিচয় সত্যায়ন করতে হলে আগে ‘বাসস্থান প্রমাণপত্র’ লাগবে।”

বাসস্থান প্রমাণপত্র করতে গেলাম। সেখানে বলল, “বাসস্থান প্রমাণপত্র পেতে হলে আগে ‘আয় প্রমাণপত্র’ আর ‘চরিত্র সনদ’ লাগবে।”

আয় প্রমাণপত্র করতে গেলাম। সেখানে বলল, “আয় প্রমাণ করতে হলে আগে ‘চাকরির সনদ’ লাগবে।”

চাকরির সনদ করতে গেলাম। সেখানে বলল, “চাকরির সনদ পেতে হলে আগে ‘শিক্ষা সনদ’ আর ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স’ লাগবে।”

এভাবে প্রতিটা অনুমতিপত্রের জন্য আরও দুই-তিনটা অনুমতিপত্র। আমি হিসেব কষে দেখলাম, আরাশের জন্মসনদের একটা কপি পেতে আমার মোট ২৭টা অনুমতিপত্র লাগবে।

এই ২৭টা কাগজ করতে করতে আমার বয়স হয়ে যাবে। আরাশ তখন হয়তো বিয়ে করে ফেলবে। তার সন্তানের জন্মসনদ বানাতে হবে। কিন্তু আমি তখনও তার জন্মসনদের কপি করতে থাকব।

হ্যাপি বলল, “এত কাগজপত্রের কী দরকার? একটা সাধারণ কপি নিতে।” আমি বললাম, “আমিও জানি না। কিন্তু তারা বলছে।”

আরাশ বলল, “আব্বু, আমার কাগজ কবে হবে?” আমি বললাম, “তুই এখনো ছোট। ধৈর্য রাখ।” কিন্তু ভিতরে ভিতরে জানি এই কাগজ হতে আরও বছরখানেক লাগবে।

সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হলো, এই ২৭টা কাগজের মধ্যে অনেক কাগজ একই জিনিস প্রমাণ করে। কিন্তু বিভিন্ন অফিসে বিভিন্ন নাম। এক জায়গায় ‘পরিচয় প্রমাণপত্র’, অন্য জায়গায় ‘স্বীকৃতি পত্র’। আসলে একই কাগজ।

আমি ভাবি, এই অনুমতিপত্রের জাল কে বানিয়েছে? কোন মানুষ বসে চিন্তা করেছে যে একটা সাধারণ কপির জন্য ২৭টা কাগজ লাগবে?

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “হে আল্লাহ, তুমি তো সব দেখ। তোমার কাছে কি কোনো অনুমতিপত্র লাগে?” কিন্তু মনে হয় আল্লাহও এই ব্যবস্থা দেখে অবাক।

গতকাল একজন বৃদ্ধ বলল, “আমার পেনশনের কাগজ করতে তিন বছর লেগেছে। এখন পেনশন কম পাচ্ছি, কারণ দেরি হয়েছে।” আমি বললাম, “তিন বছরে কতগুলো কাগজ লেগেছে?” সে বলল, “গুনি নাই। হাতে একটা থলে ভরা কাগজ।”

এই অনুমতিপত্রের জালে আমরা সবাই আটকে আছি। যে যত বেশি কাগজ সংগ্রহ করতে পারে, সে তত বড় মানুষ। কাগজবিহীন মানুষ মানুষই না।

আমার একটা স্বপ্ন আছে। একদিন একটা অনুমতিপত্র নিতে যাব। সেখানে বলবে, “আর কোনো কাগজ লাগবে না। এইটাই শেষ।” কিন্তু জানি এই স্বপ্ন কোনোদিন সত্যি হবে না।

কারণ এই ব্যবস্থায় প্রতিটা সমাধানের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করা হয়। প্রতিটা অনুমতিপত্রের জন্য নতুন অনুমতিপত্র।

আর আমরা চক্কর দিতে থাকি। এক অফিস থেকে আরেক অফিসে। একটা কাউন্টার থেকে আরেকটা কাউন্টারে।

আরাশের সেই একটা সাধারণ কপির জন্য।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *