ব্লগ

যে দরজা খোলার জন্য সারাজীবন অনুমতির অপেক্ষা

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে আমার সামনে একটা দরজা দাঁড়িয়ে আছে। কাঠের তৈরি, পুরনো একটা দরজা। হাতল আছে, খোলার জন্য শুধু ঘুরিয়ে দিলেই হয়। কিন্তু আমি পারছি না। কেন জানি মনে হয় আমার অনুমতি নেই।

ছোটবেলা থেকেই এই সমস্যা। স্কুলে পড়ার সময় ক্লাসে প্রশ্ন করতে হলে হাত তুলে অনুমতি চাইতাম। টয়লেটে যেতে হলেও অনুমতি। এমনকি পানি খেতে হলেও।

এখন আমার ৩৯ বছর বয়স। এখনো আমি অনুমতি চাই। অফিসে কোনো কাজ শুরু করার আগে বস্‌কে জিজ্ঞেস করি। বাড়িতে কিছু কিনতে চাইলে হ্যাপিকে বলি। আরাশের সাথে কোথাও যেতে চাইলেও জিজ্ঞেস করি।

কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমি নিজের কাছেও অনুমতি চাই। কিছু করার আগে ভাবি, “আমি এটা করতে পারি?” যেন আমার নিজের জীবনের উপরও আমার অধিকার নেই।

গত সপ্তাহে আরাশ বলেছিল, “আব্বু, আমি আপনার সাথে পার্কে যেতে চাই।” আমি বললাম, “আচ্ছা, মাকে জিজ্ঞেস করি।” ও বলল, “কেন? আপনি তো আমার আব্বু।”

আমি চুপ থেকে গেলাম। সত্যি তো, আমি আরাশের বাবা। আমার ছেলের সাথে সময় কাটানোর জন্য কারো অনুমতির দরকার নেই। তবুও আমি অনুমতি চাই।

কখন থেকে এই অভ্যাস? কখন থেকে আমি ভুলে গেলাম যে কিছু কিছু দরজা খোলার অধিকার আমার নিজেরই?

হ্যাপি মাঝে মাঝে রাগ করে বলে, “তুমি কেন সব কিছুতে জিজ্ঞেস করো? তুমি তো একটা পূর্ণবয়স্ক মানুষ।” কিন্তু আমি কি সত্যিই পূর্ণবয়স্ক? নাকি আমি এখনও সেই ছোট্ট ছেলে যে সব কিছুতে অনুমতি চায়?

অফিসে চাকরি করতে গিয়ে আরও বুঝলাম এই অসহায়তা। প্রতিটা কাজের জন্য ফাইল। প্রতিটা ফাইলের জন্য অনুমতি। প্রতিটা অনুমতির জন্য অপেক্ষা। আর সেই অপেক্ষার ভিড়ে আমি ভুলে গেলাম যে কিছু দরজা আমিই খুলতে পারি।

আল্লাহর কাছে দোয়া করার সময়ও মনে হয় আমার অনুমতি আছে কিনা। আমি কি যোগ্য এই দোয়া করার? আমার পাপের পরিমাণ বেশি নয় তো? আল্লাহ আমার কথা শুনবেন তো?

এভাবে দোয়াও অনুমতির অপেক্ষায় আটকে থাকে।

সবচেয়ে কষ্টের কথা হলো, আমি আরাশকেও এই অসহায়তা শেখাচ্ছি। ও যখন কিছু করতে চায়, আমি বলি, “আগে জিজ্ঞেস কর।” ও যখন কোনো স্বপ্ন দেখে, আমি বলি, “দেখ, সম্ভব কিনা।”

আমি কি ওকে সেই একই দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছি?

গতকাল রাতে স্বপ্ন দেখলাম আমি একটা বাগানে দাঁড়িয়ে আছি। সুন্দর ফুল। পাখির ডাক। কিন্তু বাগানে ঢোকার জন্য একটা দরজা পার হতে হবে। আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি কেউ এসে অনুমতি দেবে।

কিন্তু কেউ আসে না। আমি সারারাত দাঁড়িয়ে থাকি। সকালে ঘুম ভেঙে দেখি আমি এখনও অপেক্ষা করছি।

আজ আমি ঠিক করেছি। একটা দরজা আমি নিজেই খুলব। কোনো অনুমতি ছাড়াই। আরাশকে নিয়ে পার্কে যাব। হ্যাপিকে বলব, “চল, আজ আমরা বাইরে খাব।” নিজেকে বলব, “তুই একটা কাজের মানুষ। তোর নিজের উপর আস্থা রাখ।”

কিন্তু আমি জানি, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আবার আমার হাত কাঁপবে। আবার ভাববো, “আমার কি অনুমতি আছে?”

আর এই প্রশ্নের সাথেই হয়তো আমার সারাজীবন কাটবে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *