ব্লগ

অপরাধীর ডায়েরি

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আরাশ আজ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, আমি কেন রাহুলদের স্কুলে যাই না?”

রাহুল তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। ও পড়ে শহরের সবচেয়ে দামি স্কুলে। ইংরেজি মাধ্যম। এয়ার কন্ডিশন। সুইমিং পুল।

আমি কী উত্তর দেব? কীভাবে বলব যে আমার সামর্থ্য নেই?


প্রতি সন্তানের প্রাপ্য হলো সেরা শিক্ষা। কিন্তু আমি আরাশকে সেটা দিতে পারছি না।

আরাশ যে স্কুলে পড়ে, সেটা মন্দ নয়। কিন্তু সেরাও নয়। সেখানে শিক্ষকরা ভালো। কিন্তু সুবিধা সীমিত।

কম্পিউটার ল্যাব আছে, কিন্তু পুরনো কম্পিউটার। লাইব্রেরি আছে, কিন্তু বই কম। খেলার মাঠ আছে, কিন্তু ছোট।

আমি প্রতিদিন দেখি, রাহুলের মতো ছেলেরা কী কী সুবিধা পাচ্ছে। আর আরাশ কী পাচ্ছে না।

রাহুলরা সাঁতার শেখে। আরাশ শুধু শোনে সাঁতারের গল্প।

রাহুলরা কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শেখে। আরাশ শুধু দেখে কম্পিউটারের ছবি।

রাহুলরা ইংরেজিতে কথা বলে। আরাশ বাংলায় ভাবে।

এই পার্থক্যগুলো আমার বুকে ছুরির মতো বাজে।

আমি জানি, শিক্ষার মান শুধু স্কুলের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে পারিবারিক পরিবেশের ওপরও।

আমি আরাশকে বাড়িতে পড়াই। তার সাথে বই পড়ি। গল্প বলি। প্রশ্নের উত্তর দিই।

কিন্তু আমি যতই চেষ্টা করি, একটা ভালো স্কুলের সুবিধা আমি একা দিতে পারি না।

আরাশ বুদ্ধিমান। মেধাবী। কিন্তু সে যে সুবিধা পাওয়ার কথা, সেটা পাচ্ছে না।

আমার অপরাধবোধ হয় যখন দেখি রাহুল নানা বিষয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আর আরাশ পিছিয়ে পড়ছে।

না, আরাশ পিছিয়ে পড়ছে না। কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।

আমি ভাবি, আমার আর্থিক অক্ষমতার জন্য আরাশের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিনা।

আমি কি একজন ব্যর্থ বাবা?

মাঝে মাঝে ভাবি, অন্য কোনো বাবা হলে আরাশের জন্য আরো ভালো কিছু করতে পারত।

কিন্তু আরাশ কখনো অভিযোগ করে না। ও খুশি থাকার চেষ্টা করে। ওর সন্তুষ্টি দেখে আমার আরো কষ্ট হয়।

আমি চাই আরাশ দাবি করুক। বলুক, “বাবা, আমাকে ভালো স্কুলে দিন।”

কিন্তু ও বলে না। কারণ ও জানে আমার সামর্থ্য নেই।

এই বোঝাপড়া একটা এগারো বছরের ছেলের মধ্যে থাকা উচিত নয়।

আমি স্কলারশিপের খোঁজ করেছি। কিন্তু ভালো স্কুলগুলোতে স্কলারশিপ পাওয়া খুবই কঠিন।

আমি লোন নেওয়ার কথা ভেবেছি। কিন্তু আমার আয় অনিয়মিত। লোন পরিশোধ করা সম্ভব নয়।

আমি অনেক রাত জেগে কাজ করি। আরো টাকা রোজগার করার চেষ্টা করি।

কিন্তু যতই চেষ্টা করি, একটা ভালো স্কুলের খরচ আমার নাগালের বাইরে।

হ্যাপি বলে, “আরাশ যেখানে পড়ছে, সেখানেই ভালো।”

কিন্তু আমি জানি, ও এটা বলে আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য।

আরাশ একদিন বড় হবে। তখন ও বুঝবে যে তার বাবা তার জন্য সেরা করতে পারেনি।

এই চিন্তা আমাকে তাড়া করে।

কিন্তু আমি এটাও জানি যে, শিক্ষার আসল মানে স্কুলের নামে নয়। শিক্ষার আসল মানে হলো কৌতূহল জাগানো। চিন্তা করতে শেখানো। ভালো মানুষ হতে শেখানো।

এইসব আমি আরাশকে দিতে পারি। এইসব কোনো টাকার প্রয়োজন নেই।

আমি আরাশকে শেখাই কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়। কীভাবে উত্তর খুঁজতে হয়। কীভাবে মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হয়।

এইসব শিক্ষা কোনো স্কুলে পাওয়া যায় না।

আমি আশা করি, আরাশ একদিন বুঝবে যে তার বাবা তার সামর্থ্যের সবটুকু দিয়েছে।

আর সেটাই যথেষ্ট।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *