হ্যাপির মা ফোন দিয়েছেন। কথা বলতে চান। হ্যাপি ফোন দিলো আমার দিকে। আমি কথা বললাম। কিন্তু সেই কথায় কোনো আন্তরিকতা ছিল না। ছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতা।
বিয়ের পনেরো বছর পরেও আমি হ্যাপির পরিবারের কাছে একজন বহিরাগত।
বিয়ের আগে মনে হয়েছিল, হ্যাপির পরিবার আমার পরিবার হয়ে যাবে। তাদের ঘর আমার ঘর হবে। তাদের আনন্দ-বেদনা আমার আনন্দ-বেদনা হবে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
হ্যাপির বাবা-মা ভদ্র মানুষ। তারা আমার সাথে ভালো ব্যবহার করেন। কিন্তু সেই ভালো ব্যবহার হৃদয় থেকে আসে না। আসে শিষ্টাচার থেকে।
আমি যখন তাদের বাড়িতে যাই, তারা আমাকে মেহমানের মতো সম্মান করেন। কিন্তু পরিবারের সদস্য মনে করেন না।
তাদের পারিবারিক আলোচনায় আমি অংশ নিতে পারি না। তারা তাদের নিজেদের ভাষায় কথা বলেন। আমি বুঝতে পারি, কিন্তু সেই কথার গভীরে প্রবেশ করতে পারি না।
হ্যাপির ভাই-বোনদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তারা আমাকে দিদির স্বামী হিসেবে দেখে। আত্মীয় হিসেবে নয়।
আমি বুঝি, এই দূরত্বের জন্য আমিও দায়ী। আমি তাদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করিনি। আমি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছি।
কিন্তু চেষ্টা করলেও কি পারতাম? তাদের সংস্কৃতি, তাদের চিন্তাভাবনা আমার থেকে আলাদা।
হ্যাপির বাবা একটা সরকারি চাকরি করতেন। তিনি নিয়মকানুনের মানুষ। আমার অনিয়মিত জীবনযাত্রা তার পছন্দ নয়।
হ্যাপির মা গৃহিণী। তিনি চান তার মেয়ে সুখে থাকুক। কিন্তু আমার আর্থিক অস্থিরতা দেখে তিনি চিন্তিত।
আমি জানি, তারা ভাবেন আমি হ্যাপির জন্য সঠিক পছন্দ ছিলাম না। তারা চেয়েছিলেন এমন একজনকে যার স্থিতিশীল চাকরি আছে। সামাজিক মর্যাদা আছে।
এই চিন্তা আমাকে কষ্ট দেয়। আমি প্রমাণ করতে চাই যে আমি ভালো স্বামী। ভালো জামাই। কিন্তু আমার সীমাবদ্ধতা আছে।
হ্যাপির পরিবারের অনুষ্ঠানে আমি যাই। কিন্তু সেখানে আমি একা থাকি। কারো সাথে খোলামেলা কথা বলতে পারি না।
অন্য জামাইরা তাদের সাফল্যের গল্প বলেন। তাদের চাকরির উন্নতির কথা বলেন। আমার কোনো গল্প নেই।
আমি লেখালেখি করি। কিন্তু সেটা তাদের কাছে কোনো কাজ মনে হয় না। তারা ভাবেন এটা সময় নষ্টের কাজ।
হ্যাপি আমার কষ্ট বোঝে। কিন্তু সে কিছু বলে না। কারণ সে জানে এতে আরো জটিলতা বাড়বে।
আমি চাই না হ্যাপি আমার জন্য তার পরিবারের সাথে সম্পর্ক খারাপ করুক। তাই আমি নীরবে সহ্য করি।
কিন্তু এই নীরব সহ্য করা আমার ভিতরে একটা তিক্ততা তৈরি করেছে। আমি অনুভব করি যে আমি হ্যাপির জীবনে একটা বোঝা।
আরাশের জন্ম হওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। তারা আরাশকে নিয়ে খুশি। আমাকে একটা ভালো বাবা মনে করেন।
কিন্তু তবুও আমি তাদের কাছে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হতে পারিনি।
আমি বুঝি, এই সমস্যার সমাধান আমার হাতে। আমাকে আরো চেষ্টা করতে হবে। তাদের সাথে সম্পর্ক উন্নতি করতে হবে।
কিন্তু এই চেষ্টা একতরফা হলে হবে না। তাদেরও আমাকে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে।
আমি আশা করি, সময়ের সাথে সাথে আমাদের সম্পর্ক উন্নতি হবে। আমি যে হ্যাপিকে ভালোবাসি, আরাশকে ভালো বাবা, সেটা তারা বুঝবেন।
কারণ পরিবার মানে তো শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়। পরিবার মানে ভালোবাসার সম্পর্ক। আর ভালোবাসা সময় নিয়ে তৈরি হয়।
আমি প্রতীক্ষায় আছি সেই সময়ের।
একটু ভাবনা রেখে যান