ব্লগ

অশালীন সত্য

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে আটকে আছি দুই ঘণ্টা। মিটিং মিস করব। বস রেগে যাবে। মুখ থেকে বেরিয়ে গেল—”শালার এই শহর!” তারপর লজ্জা পেলাম। কিন্তু মনে মনে স্বীকার করলাম—এই শব্দটা আমার হতাশা ভালোভাবে প্রকাশ করেছে।

গালি কি আবেগের একটা খাঁটি রূপ?

অফিসে কোনো কাজ ঠিকমতো হলো না। কলিগ বলল, “What the hell!” আমি বললাম, “ডাম্বাসরা।” দুজনেই একই রাগ প্রকাশ করলাম। কিন্তু গালির ভাষা ভিন্ন।

আরাশ যখন পরীক্ষায় খারাপ করেছে, মনে মনে বলেছি—”ছেলেটা একদম বেকুব।” কিন্তু মুখে বলেছি, “আরো চেষ্টা করতে হবে।” গালিতে আমার আসল হতাশা। শিষ্ট ভাষায় সামাজিক মুখোশ।

গালি কি আবেগের খাঁটি প্রকাশ?

বন্ধুদের সাথে বসে ফুটবল খেলা দেখি। আমাদের দল গোল করলে—”ইয়েস! বেশ!” হেরে গেলে—”চুদির ভাই!” এই গালি আনন্দ আর দুঃখ দুটোই প্রকাশ করে। শালীন ভাষায় এত তীব্রতা আনা যায় না।

গালি তীব্রতা দেয়। যেটা সভ্য ভাষায় সম্ভব নয়।

কিন্তু গালি কেন সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ? কারণ সেটা অভদ্র? নাকি কারণ সেটা খুব সৎ?

আমি যখন “বেশ্যার পোলা” বলি, আমি আসলে বলতে চাই—”এই মানুষটা আমাকে চরম হতাশ করেছে।” কিন্তু গালিতে সেই আবেগ আরো জোরালো।

বিভিন্ন ভাষার গালি ভিন্ন। ইংরেজিতে “Fuck,” হিন্দিতে “বেহেনচোদ,” বাংলায় “মাগির পোলা।” প্রতিটি সংস্কৃতির নিজস্ব গালির ভান্ডার। কেন? কারণ গালি সংস্কৃতির অংশ।

শিশুরা গালি শেখে কীভাবে? কেউ তাদের শেখায় না। কিন্তু তারা জানে গালি দিলে বড়রা রেগে যায়। তারা জানে গালির শক্তি।

গালি ক্ষমতার ভাষা। যে গালি দেয়, সে তার আবেগ ছেড়ে দেয়। যে গালি শোনে, সে প্রভাবিত হয়।

কিন্তু গালির নেতিবাচক দিক আছে। গালি আঘাত করে। অপমান করে। সম্পর্ক নষ্ট করে।

স্ত্রীকে রাগের মাথায় গালি দিয়েছিলাম। পরে মাফ চেয়েছি। কিন্তু সেই কথা তার মনে থেকে গেছে। গালি ক্ষমার চেয়ে দ্রুত বলা হয়।

তাহলে কি গালি দেওয়া উচিত নয়? নাকি নিয়ন্ত্রিত গালি আবেগ প্রকাশের স্বাস্থ্যকর উপায়?

কিছু গবেষণা বলে গালি দিলে ব্যথা কমে। স্ট্রেস রিলিফ হয়। তাহলে গালি কি আবেগের ভাল্ব?

সমস্যা হলো—গালি যখন অভ্যাস হয়ে যায়, তখন সেটা আর আবেগ প্রকাশ করে না। হয়ে যায় কথার মালা।

রিকশাওয়ালা প্রতিটি বাক্যে গালি দেয়। তার কাছে গালি আবেগ নয়, ভাষার অংশ।

আমাদের সমাজে গালি নিয়ে দ্বিমুখী নীতি। পুরুষের গালি “স্বাভাবিক,” নারীর গালি “অশালীন।” ধনীর গালি “প্রাণবন্ত,” গরিবের গালি “অভদ্র।”

গালির রাজনীতি আছে।

কিন্তু মূল প্রশ্ন থাকে—গালি কি আবেগের খাঁটি প্রকাশ? নাকি আবেগের বিকৃতি?

হয়তো দুটোই। কখনো খাঁটি, কখনো বিকৃত। নির্ভর করে কেন, কীভাবে, কার কাছে।

আমার মনে হয় গালি মানুষের আবেগের একটা কাঁচা রূপ। যেটা পালিশ করা হয়নি। সভ্যতার কোট পরানো হয়নি।

সেই কাঁচা আবেগের ভালো-খারাপ দুটো দিকই আছে।

গালি এড়ানো উচিত। কিন্তু একেবারে অস্বীকার করাও ভণ্ডামি।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *