রাতের খাবার খেতে বসে হঠাৎ করে ভাবলাম, আমি কতগুলো বাক্য অসমাপ্ত রেখে দিয়েছি জীবনে। “আমি চাই…” “আমার স্বপ্ন ছিল…” “একদিন আমি…” এই বাক্যগুলো কখনো শেষ করতে পারিনি।
হ্যাপি বলছিল, “তুমি যদি সেই চাকরিটা…” কিন্তু বাক্য শেষ করতে পারল না। আমি জানি ও কী বলতে চেয়েছিল। আমিও জানি কেন বলতে পারল না। কিছু কথা অসমাপ্ত রেখে দেওয়াই ভালো।
আরাশ প্রশ্ন করেছিল, “আব্বু, আপনি কেন…” তারপর চুপ হয়ে গেছে। আমিও উত্তর দেইনি। কারণ আমি জানি না আমি কেন।
আমার জীবনটাই যেন একটা অসমাপ্ত বাক্য। “আমি হায়দার, আমি…” কিন্তু এরপর কী? আমি কী? কী করি? কী চাই? জানি না।
চাকরির ইন্টারভিউয়ে বলতে চেয়েছিলাম, “আমার অভিজ্ঞতা আছে…” কিন্তু কী অভিজ্ঞতা? হার মানার অভিজ্ঞতা? ব্যর্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা?
বন্ধু জামিউলকে বলতে চেয়েছিলাম, “আমার একটা পরিকল্পনা ছিল…” কিন্তু সেই পরিকল্পনা এখন কোথায়? হারিয়ে গেছে অসমাপ্ত স্বপ্নের গোরস্থানে।
হ্যাপির বাবা একবার বলতে শুরু করেছিলেন, “হায়দার একটা ভালো ছেলে, কিন্তু…” সেই “কিন্তু”র পরে কী ছিল? আমি জানতে চাইনি। কারণ জানতাম উত্তরটা ভালো হবে না।
আল্লাহর কাছে দোয়া করতে গিয়েও বাক্য অসমাপ্ত থেকে যায়। “হে আল্লাহ, আমি চাই…” কী চাই? সুখ? শান্তি? নাকি শুধু এই অসমাপ্ত জীবন থেকে মুক্তি?
আমার বাবা মৃত্যুর আগে বলতে চেয়েছিলেন, “হায়দার, তুই…” কিন্তু শেষ করতে পারেননি। এখনও জানি না উনি কী বলতে চেয়েছিলেন।
আরাশের সাথে গল্প করতে গিয়ে বলি, “বাবা যখন তোমার বয়সে ছিল…” তারপর থেমে যাই। কারণ আমার সেই বয়সের গল্প বলার মতো কিছু নেই।
অফিসে বস্ বলেছিলেন, “হায়দার, তুমি যদি আরও…” কিন্তু আরও কী? আরও পরিশ্রমী? আরও চালাক? আরও নমনীয়? আমি তো সবই চেষ্টা করেছি।
হ্যাপি মাঝে মাঝে বলতে শুরু করে, “আমাদের জীবনে যদি…” কিন্তু সেই “যদি” কখনো “তাহলে”তে পৌঁছায় না।
আমার সব স্বপ্ন অসমাপ্ত বাক্যের মতো। “একদিন আমি একটা ব্যবসা করব…” “একদিন আরাশকে নিয়ে ঘুরতে যাব…” “একদিন হ্যাপিকে সুখী করব…” কিন্তু সেই “একদিন” কখনো আসে না।
আমার শিক্ষাও অসমাপ্ত। “আমি যদি আরও পড়তে পারতাম…” কিন্তু পারিনি। সংসারের চাপে সব অসমাপ্ত রেখে দিতে হয়েছে।
আমার ভালোবাসাও অসমাপ্ত। হ্যাপিকে বলতে চাই, “আমি তোমাকে…” কিন্তু শব্দ খুঁজে পাই না। কীভাবে বলব কতটা ভালোবাসি?
আরাশকে বলতে চাই, “তুই আমার…” কিন্তু কী? গর্ব? আশা? জীবনের একমাত্র অর্থ? সব কিছুই, কিন্তু কোনো শব্দেই প্রকাশ করতে পারি না।
সবচেয়ে অসমাপ্ত আমার প্রার্থনা। “আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা কর…” কীসের জন্য ক্ষমা? সব কিছু অসমাপ্ত রাখার জন্য? নাকি সমাপ্ত করার সাহস না পাওয়ার জন্য?
রাতে ঘুমানোর আগে ভাবি, আমার জীবনের কোনো বাক্য কি কখনো সমাপ্ত হবে? নাকি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এভাবেই অসমাপ্ত থেকে যাবে?
হয়তো এটাই মানুষের নিয়তি। আমরা সবাই অসমাপ্ত বাক্যের মতো অসমাপ্ত জীবন নিয়ে বেঁচে থাকি।
আর মৃত্যুই হয়তো আমাদের জীবনের একমাত্র পূর্ণবিরাম।
একটু ভাবনা রেখে যান