কমিটির অসীম চক্র
আমাদের দেশে কাজ হয় না। কিন্তু কমিটি গঠন হয়।
গত সপ্তাহে অফিসের নোটিশ বোর্ডে একটা কাগজ দেখলাম: “কমিটি গঠন বিষয়ক কমিটি গঠিত হয়েছে।” প্রথমে ভাবলাম ভুল পড়েছি। আবার পড়লাম। না, ঠিকই আছে। একটা কমিটি গঠন করার জন্য আরেকটা কমিটি।
কিন্তু সেই কমিটি কে গঠন করলো? নিশ্চয়ই আরেকটা কমিটি। তাহলে সেটা? আরেকটা।
চোখের সামনে একটা অসীম সিঁড়ি ভেসে উঠলো। যার কোনো শুরু নেই, শেষ নেই। শুধু কমিটি আর কমিটি।
ছোটবেলায় গণিতে অসীম ধারা পড়েছিলাম। 1 + 1/2 + 1/4 + 1/8… এভাবে চলতে থাকে। কিন্তু সেটার অন্তত একটা যোগফল আছে। কমিটির ধারার কোনো যোগফল নেই। শুধু বিয়োগ — সময়ের, শ্রমের, সম্ভাবনার।
সাব্বির আমার কলিগ। ওর ল্যাপটপ নষ্ট হয়েছিল তিন মাস আগে। সাধারণ সমস্যা — স্ক্রিন কাজ করছে না।
প্রথম সপ্তাহে গঠিত হলো “আইটি সমস্যা নিরূপণ কমিটি।” চার সদস্য। দুই সপ্তাহ মিটিং করে তারা সিদ্ধান্ত নিলো — সমস্যাটা আসলেই আছে।
দ্বিতীয় মাসে এলো “মেরামত না কি ক্রয় নির্ধারণ কমিটি।” পাঁচ সদস্য। তারা গবেষণা করলো — মেরামত করা উচিত নাকি নতুন কেনা উচিত।
কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে “বাজেট বরাদ্দ কমিটি”র অনুমোদন লাগবে। আর বাজেট কমিটি বসবে পরের কোয়ার্টারে।
সাব্বির এখন কাগজে কলমে কাজ করে। একবিংশ শতাব্দীতে বসে।
কমিটি আসলে একটা জাদুর কাঠি। যেকোনো সমস্যায় এটা ঘোরালেই সমস্যা অদৃশ্য হয়ে যায়। সমাধান হয় না, কিন্তু সমস্যাটা আর কারো একার মাথাব্যথা থাকে না।
কারণ দায়িত্ব এখন কমিটির। আর কমিটি মানে সবার। সবার মানে কারো না।
রিমার মেয়ে তাহিয়া তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। গত মাসে স্কুলে অভিযোগ করেছিল — টয়লেট নোংরা, যেতে ভয় লাগে।
স্কুল কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নিলো। “স্যানিটেশন উন্নয়ন কমিটি” গঠন করলো।
সেই কমিটি প্রথম মিটিংয়ে ঠিক করলো — আগে জানতে হবে ঠিক কোন টয়লেট নোংরা। তাই “টয়লেট পরিদর্শন উপকমিটি” দরকার।
পরিদর্শন শেষে রিপোর্ট এলো — সব টয়লেটই নোংরা। এবার “অগ্রাধিকার নির্ধারণ কমিটি” বসলো — কোনটা আগে পরিষ্কার করা হবে?
তাহিয়া এখন স্কুলে টয়লেটে যায় না। সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে সব সেরে যায়।
কমিটি এখনো কাজ করছে।
কমিটির সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এর গণতান্ত্রিক চরিত্র। সবার মতামত নেওয়া হয়। সবার কথা শোনা হয়। এবং শেষ পর্যন্ত কারোর কথাই কাজে লাগে না।
কারণ যত বেশি মতামত, তত বেশি দ্বিমত। তত বেশি সাব-কমিটি।
“সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত যাচাই কমিটি” একটা জিনিস হতেই পারে।
আমাদের এলাকায় একটা রাস্তা আছে। বর্ষাকালে সেটা নদী হয়ে যায়। শুকনো মৌসুমে চাঁদের পৃষ্ঠ।
পাঁচ বছর আগে “রাস্তা উন্নয়ন কমিটি” গঠিত হয়েছিল। তারা প্রথমে “সমস্যা চিহ্নিতকরণ কমিটি” বানালো। সেই কমিটি “ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কমিটি” সুপারিশ করলো। তারপর এলো “বাজেট প্রাক্কলন কমিটি,” “ঠিকাদার নির্বাচন কমিটি,” “কাজ তদারকি কমিটি।”
পাঁচ বছরে পাঁচটা কমিটি। এগারোটা মিটিং। তেইশ পৃষ্ঠা রিপোর্ট।
রাস্তা এখনো একই আছে। গর্তগুলো শুধু একটু বড় হয়েছে।
একদিন আমার ছেলে আরাশ জিজ্ঞেস করলো, “বাবা, এত কমিটি কেন?”
আমি বললাম, “যাতে কেউ দোষী না হয়।”
ও বুঝলো না। আমি বুঝিয়ে বললাম — যখন একজন মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়, ভুল হলে সে দায়ী। কিন্তু যখন কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, ভুল হলে কেউ দায়ী না।
“তাহলে সবাই কমিটি বানায়?”
“হ্যাঁ, বাবা। এটাকে বলে চতুরতা।”
হাসপাতালের কথা বলি।
গত বছর শাশুড়ি অসুস্থ হলে একটা সরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানে দেয়ালে সাইনবোর্ড দেখলাম — “রোগী সেবা উন্নয়ন কমিটি।”
জিজ্ঞেস করলাম, “এই কমিটি কী করে?”
উত্তর পেলাম, “মিটিং করে।”
“মিটিংয়ে কী হয়?”
“সিদ্ধান্ত হয় আর কী কী কমিটি লাগবে।”
এখন সেই হাসপাতালে “ওষুধ ব্যবস্থাপনা কমিটি,” “জনবল নিয়োগ কমিটি,” “অবকাঠামো উন্নয়ন কমিটি,” “অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি” — সব আছে।
শুধু ওষুধ নেই, জনবল নেই, অবকাঠামো ভাঙা, অভিযোগ জমা হচ্ছে।
কমিটি কাজ করছে।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি — সৃষ্টিকর্তা যদি কমিটি করতেন?
“পৃথিবী সৃষ্টি বিষয়ক কমিটি” প্রথমে “গ্রহ নকশা উপকমিটি” গঠন করতো। তারপর “জীববৈচিত্র্য পরিকল্পনা কমিটি।” তারপর “মানুষ সৃষ্টির যৌক্তিকতা নিরূপণ কমিটি।”
হয়তো এখনো পৃথিবী তৈরি হতো না। শুধু মিটিং চলতো।
ভাগ্যিস আল্লাহ একাই সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু কমিটিকে পুরোপুরি দোষ দেওয়াও ঠিক না।
কমিটির পেছনে আছে আমাদের ভয়। দায়িত্ব নেওয়ার ভয়। ভুল করার ভয়। একা দাঁড়ানোর ভয়।
যখন কেউ বলে “কমিটি করো,” সে আসলে বলছে “আমি একা পারব না।” অথবা “আমি একা চাই না।” অথবা সবচেয়ে সৎ অর্থে — “আমি দায় নিতে রাজি না।”
কমিটি হলো সেই লুকানোর জায়গা যেখানে ব্যক্তি হারিয়ে যায়।
একটা মজার হিসাব করি।
ধরো, একটা কমিটিতে পাঁচজন সদস্য। প্রতি মাসে একটা মিটিং, দুই ঘণ্টা করে। বছরে চব্বিশ ঘণ্টা।
যদি সেই কমিটি তিনটা সাব-কমিটি বানায়, প্রতিটায় চারজন করে — আরো বাহাত্তর ঘণ্টা।
এখন যদি সব মিলিয়ে দশটা কমিটি থাকে একটা প্রতিষ্ঠানে…
অংকটা তুমি করো। আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি।
শুধু এটুকু বলি — ঐ সময়ে একজন মানুষ একা যা করতে পারতো, সেটা এখন কাগজে লেখা আছে “আলোচনাধীন।”
ফারহানের কথা বলি শেষে।
ফারহান আমার স্কুলের বন্ধু। সে একটা ছোট স্টার্টআপ চালায়। পাঁচজন কর্মী।
একদিন জিজ্ঞেস করলাম, “তোর অফিসে কমিটি আছে?”
হেসে বললো, “একটা আছে — আমি।”
“মানে?”
“সমস্যা হলে আমি দেখি। সিদ্ধান্ত নিই। ভুল হলে ঠিক করি। কাজ হয়ে যায়।”
ওর কোম্পানি গত বছর দুই কোটি টাকা আয় করেছে।
পাশের সরকারি অফিসে “রাজস্ব বৃদ্ধি কমিটি” এখনো বৈঠক করছে।
রাতে শুতে যাওয়ার আগে মাঝে মাঝে ভাবি — আমার নিজের জীবনেও কি কমিটি আছে?
সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কি আমি “পরিবারের মতামত কমিটি,” “বন্ধুদের পরামর্শ কমিটি,” “সমাজ কী বলবে কমিটি” — এসব ডাকি?
হয়তো ডাকি।
তাই হয়তো আমার অনেক স্বপ্ন এখনো “আলোচনাধীন।”
এই লেখাটা শেষ করার আগে একটা প্রস্তাব রাখি।
একটা কমিটি গঠন করা হোক — “কমিটি বিলুপ্তি কমিটি।”
কিন্তু সেই কমিটি গঠন করতে হলে আগে…
থাক। তুমি বুঝে গেছ।
একটু ভাবনা রেখে যান