ব্লগ

অতীতের প্রতিধ্বনি

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ আরাশ স্কুল থেকে এসে বলল, “বাবা, আমার বন্ধু তানভীর গান শেখে। সে বলেছে—প্রথম দিনেই সুর ধরতে পারছে। অথচ তার পরিবারে কেউ গায়ক নেই।”

আমি ভাবলাম। এটা কেমন সম্ভব? সঙ্গীত শেখার জন্য অনুশীলন লাগে। কিন্তু কেউ কেউ যেন আগে থেকেই জানে।

“হয়তো তার মধ্যে প্রাকৃতিক প্রতিভা আছে,” আমি বললাম।

কিন্তু মনে মনে ভাবলাম—এই ‘প্রাকৃতিক প্রতিভা’ আসে কোথা থেকে?

সন্ধ্যায় একটা বই পড়ছিলাম। রুপার্ট শেলড্রেকের মরফিক রেজোন্যান্স তত্ত্ব। তার মতে—অতীতের অভিজ্ঞতা একটা ‘ফিল্ড’ তৈরি করে। নতুন প্রজন্ম সেই ফিল্ড থেকে শেখে।

যেমন—প্রথম ইঁদুর যখন গোলকধাঁধা সমাধান করে, তা কঠিন। কিন্তু পরের ইঁদুরদের জন্য সহজ হয়ে যায়। যদিও তারা প্রথম ইঁদুরকে দেখেনি।

তাহলে কি তানভীরের ক্ষেত্রেও এরকম? হাজার বছর ধরে মানুষ গান গেয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা কি একটা ‘মরফিক ফিল্ড’ তৈরি করেছে?

আমি নিজের ক্ষেত্রে ভাবলাম। আমি প্রথম সাইকেল চালানো শিখেছিলাম দ্রুত। কেউ শেখায়নি। বাবা শুধু পেছনে ধরে রেখেছিলেন। হঠাৎ ছেড়ে দিলেন। আমি পড়ে যাইনি।

এটা কি মরফিক রেজোন্যান্স? লক্ষ লক্ষ মানুষ সাইকেল চালিয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা কি আমাকে সাহায্য করেছে?

হ্যাপিকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি মনে করো আমাদের পূর্বপুরুষদের শেখা জিনিস আমাদের মধ্যে থেকে যায়?”

“ডিএনএ-তে তো থাকে।”

“না, ডিএনএ ছাড়া। একটা অদৃশ্য ক্ষেত্রে।”

হ্যাপি ভাবল। “হতে পারে। তুমি যেমন রান্না করতে পারো। কেউ শেখায়নি।”

সত্যি কথা। আমি হ্যাপির দেখাদেখি রান্না শিখেছি। কিন্তু কিছু জিনিস যেন আগে থেকেই জানতাম। কোন মশলা কখন দিতে হয়। কতটুকু লবণ লাগে।

এটা কি আমার মায়ের রান্নার মরফিক ফিল্ড? নাকি হাজার বছরের রান্নার সম্মিলিত অভিজ্ঞতা?

আরাশের দিকে তাকালাম। সে যখন প্রথম হাঁটতে শিখেছিল, খুব দ্রুত শিখেছিল। পড়ে পড়ে শেখেনি। যেন জানতই।

হাঁটা তো মানুষের সবচেয়ে পুরনো দক্ষতা। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মানুষ হাঁটছে। এই অভিজ্ঞতা কি আরাশের মধ্যে সংরক্ষিত?

আমি আরো ভাবলাম। ভাষা শেখা। আরাশ যখন প্রথম কথা বলতে শুরু করেছিল, গ্রামার জানত না। কিন্তু সঠিক বাক্য বলত।

কেউ তাকে শেখায়নি যে—”আমি খাবো” সঠিক, “খাবো আমি” ভুল। কিন্তু সে জানত।

এটা কি ভাষার মরফিক ফিল্ড? হাজার বছরের কথা বলার অভিজ্ঞতা?

আমার নিজের লেখালেখির কথা ভাবলাম। আমি কখনো সাহিত্যের ক্লাস নিইনি। কিন্তু যখন লিখি, কিছু নিয়ম যেন জানি। কেমন করে গল্প শুরু করতে হয়। কোথায় থামতে হয়।

এটা কি কবি-সাহিত্যিকদের মরফিক ফিল্ড? তাদের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা?

জামিউরের ব্যবসার কথা মনে পড়ল। সে কোনো বিজনেস স্কুলে যায়নি। কিন্তু ব্যবসার অনেক কলাকৌশল জানে। কখন কিনতে হয়। কখন বেচতে হয়।

এটাও কি হাজার বছরের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার ফল?

সাইফুলের কম্পিউটার প্রোগ্রামিং। সে বলেছিল—”মাঝে মাঝে মনে হয় কোডটা আগে থেকেই আমার মাথায় আছে। শুধু টাইপ করছি।”

এটা কি প্রোগ্রামারদের মরফিক ফিল্ড?

কিন্তু তাহলে প্রশ্ন হলো—খারাপ অভিজ্ঞতাও কি এভাবে চলে আসে?

যুদ্ধের ভয়। অবিশ্বাস। হিংসা। এগুলোও কি মরফিক ফিল্ডে জমা হয়?

আমার নিজের কিছু অযৌক্তিক ভয় আছে। অন্ধকার। উঁচু জায়গা। এগুলো কোথা থেকে এলো?

হয়তো আমার পূর্বপুরুষদের ভয়। যারা অন্ধকারে বিপদের মুখে পড়েছিল। উঁচু থেকে পড়ে গিয়েছিল।

তাদের ভয় কি আমার মধ্যে এসেছে?

আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি কখনো অনুভব করো যে তুমি কিছু জানো, কিন্তু কোথায় শিখেছো মনে নেই?”

“হ্যাঁ। আমি গাছে উঠতে পারি। কেউ শেখায়নি।”

“আর কী?”

“সাঁতার। প্রথমবার পানিতে নামলেই হাত-পা চালাতে পেরেছিলাম।”

আমি অবাক হলাম। এগুলো মানুষের প্রাচীন দক্ষতা। আমাদের পূর্বপুরুষরা গাছে থাকত। সাঁতার কাটত।

এই দক্ষতাগুলো কি আরাশের মধ্যে মরফিক রেজোন্যান্সের মাধ্যমে এসেছে?

রাতে ভাবলাম—যদি এই তত্ত্ব সত্যি হয়, তাহলে আমাদের দায়িত্ব কী?

আমি যা শিখি, যা অভিজ্ঞতা করি, তা কি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা ফিল্ড তৈরি করছে?

আমার ভালো অভিজ্ঞতা কি আরাশের কাজে আসবে? আমার ভুলগুলো কি তার জন্য বাধা হবে?

তাহলে আমার ভালো কাজ করার আরো বেশি দায়িত্ব। শুধু নিজের জন্য নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও।

আমি যদি সৎ থাকি, তাহলে সততার ফিল্ড শক্তিশালী হয়।

আমি যদি ভালোবাসা দিই, তাহলে ভালোবাসার ফিল্ড বৃদ্ধি পায়।

আমি যদি জ্ঞান অর্জন করি, তাহলে জ্ঞানের ফিল্ড সমৃদ্ধ হয়।

এভাবে আমি হয়তো অদৃশ্যভাবে ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করছি।

আমার প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি কাজ, প্রতিটি অনুভূতি—সব কিছু হয়তো একটা বৃহত্তর ক্ষেত্রে যোগ হচ্ছে।

আর এই ক্ষেত্র থেকেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিখবে।

এই উপলব্ধি আমাকে আরো দায়িত্বশীল করে তুলল। আমি শুধু আমার জন্য বাঁচি না। আমি সবার জন্য বাঁচি।

কারণ আমার অভিজ্ঞতা মরে যায় না। তা অদৃশ্য ক্ষেত্রে থেকে যায়। ভবিষ্যতকে গড়ে তোলে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *