ফোনে হ্যাপির বোন বলল, “আজ সন্ধ্যায় যাচ্ছি তোমাদের ওখানে। বাচ্চারাও আসবে।” ফোন রেখে দেওয়ার সাথে সাথেই ঘরের পরিবেশ পাল্টে গেল। হ্যাপির মুখে একধরনের চাপা আতঙ্ক। আমার মনেও শুরু হল হিসেব-নিকেশ।
সাধারণত আমরা তিনজন মিলে যা খাই, আজ হবে সাতজন। হ্যাপির বোন, তার স্বামী আর দুই বাচ্চা। এর মানে রান্নাঘরে হবে পূর্ণ যুদ্ধাবস্থা।
হ্যাপি প্রথমেই বলল, “বাজার করতে হবে। আর কী কী রান্না করব ভাবতে হবে।” আমি বললাম, “যা আছে তাই দিয়ে হবে না?” সে এমনভাবে তাকাল যেন আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বোকা কথা বলেছি।
আরাশ বুঝে গেল আজ ঘরে বিশেষ অবস্থা। বলল, “আমি কি বন্ধুর বাসায় থাকব?” হ্যাপি বলল, “না, তুই থাক। হাত লাগাবি।”
বাজারে গিয়ে হিসেব করতে গিয়ে মাথা ঘুরে গেল। চিকেন কিনতে হবে, কারণ বাচ্চারা মাছ খায় না। সবজি বেশি কিনতে হবে। চাল বেশি রান্na করতে হবে। মিষ্টি কিনতে হবে। এই হিসেবে এই মাসের বাজেট গিয়ে মার খেল।
বাড়ি ফিরে দেখি হ্যাপি রান্নাঘরে তোলপাড় করছে। সব পাত্র বের করা। কোনটা দিয়ে কী রান্na করবে, সেই পরিকল্পনা করছে। আমাকে দেখেই বলল, “তুমি হাতটা লাগাও। আলু-পেঁয়াজ কেটে দাও।”
রান্নার সময় বুঝলাম আমাদের ছোট্ট রান্নাঘরটা তিনজনের জন্য। দুজন একসাথে কাজ করতে গেলেই ধাক্কাধাক্কি। হ্যাপি চুলায় কাজ করছে, আমি কাটাকুটি করছি, আরাশ বাসন ধুচ্ছে। রান্নাঘরে যেন একটা ছোট যুদ্ধ চলছে।
সবচেয়ে কঠিন হল সময় ম্যানেজ করা। কোনটা আগে রান্না করব, কোনটা পরে। হ্যাপি বলল, “মাংস আগে চাপাও। তারপর ভাত বসাও।” আমি বললাম, “ভাত আগে না?” তার উত্তরে বুঝলাম রান্নার একটা বিজ্ঞান আছে যেটা আমি বুঝি না।
সন্ধ্যা ছয়টার সময় বুঝলাম আমরা সময়ের চেয়ে পিছিয়ে আছি। অতিথিরা এসে পড়বেন, কিন্তু রান্না এখনো শেষ হয়নি। হ্যাপির কপালে ঘাম, আমার হাত কাঁপছে তাড়াহুড়োর চাপে।
আরাশ বলল, “আব্বু, আপনারা কেন এত চিন্তা করছেন? খেতে দিলেই তো হল।” এগারো বছরের ছেলেটা বুঝে না যে অতিথি আপ্যায়ন কতটা জটিল বিষয়।
অতিথিরা এসে পৌঁছালেন। হ্যাপি দৌড়ে গিয়ে তাদের বসাল। আমি রান্নাঘরে একা লড়াই করছি শেষ রান্নাটা নিয়ে। মনে হচ্ছে আমি একটা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি যেটার নিয়মকানুন আমি জানি না।
খাওয়ার সময় হ্যাপির বোন বলল, “খুব ভালো হয়েছে।” কিন্তু আমি জানি আমরা যে পরিমাণ চাপ নিয়েছি, সেটার অর্ধেকও দরকার ছিল না। তারা যা পেত তাতেই খুশি থাকতেন।
রাতে অতিথিরা চলে যাওয়ার পর রান্নাঘর দেখে মনে হল একটা ঝড় গিয়েছে। সব পাত্র, সব বাসন এলোমেলো। হ্যাপি ক্লান্তিতে সোফায় বসে পড়েছে।
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “অতিথি সেবা এত কঠিন কেন? নাকি আমরাই বেশি জটিল করে তুলি?” মনে হয় উত্তর পাচ্ছি – “ভালোবাসা আর সম্মান দেখানোর জন্যই এই পরিশ্রম।”
বুঝলাম অতিথি আসার এই তোলপাড়টা শুধু রান্নার না। এটা আমাদের সংস্কৃতির অংশ। অতিথি দেবো ভব – এই বিশ্বাসটাই আমাদের এত কিছু করতে বাধ্য করে।
পরদিন সকালে হ্যাপি বলল, “ভালোই লাগল। আবার ডাকতে হবে।” আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, এত কষ্টের পরেও আবার সেই একই কষ্ট করতে চাওয়া – এটাই বোধহয় মানুষের সবচেয়ে সুন্দর দিক।
একটু ভাবনা রেখে যান