ব্লগ

অভিনেতার মঞ্চ

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

সকালে হ্যাপির সাথে তর্ক হয়েছে। বিষয়টা আর্থিক। আমি টাকার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যা হ্যাপির পছন্দ হয়নি।

আমরা কথা বলিনি। কিন্তু চুপচাপ রাগ করে আছি। এমন সময় আরাশ এসে বলল, “বাবা, আমার সাথে খেলবে?”

আমি হাসলাম। কিন্তু সেই হাসি আসল নয়।


আরাশ বুঝতে পারে না যে তার বাবা-মা রাগ করে আছে। কারণ আমরা তাকে বুঝতে দিই না।

আমরা তার সামনে অভিনয় করি। অভিনয় করি যে সব স্বাভাবিক।

আমি আরাশের সাথে খেলি। কিন্তু আমার মন খেলায় নেই। আমার মন হ্যাপির রাগে।

হ্যাপি রান্নাঘরে কাজ করছে। আগের চেয়ে জোরে জোরে পাত্র নাড়ছে। এটাই তার রাগ প্রকাশের উপায়।

আরাশ বলল, “মা, তুমিও আসো। আমরা তিনজনে খেলি।”

হ্যাপি এসে বসল। কিন্তু আমার দিকে তাকাল না।

আমরা তিনজনে লুডো খেলতে বসলাম। কিন্তু আমার আর হ্যাপির মধ্যে কোনো কথা নেই।

আরাশ বলল, “বাবা, তুমি কেন চুপচাপ?”

আমি বললাম, “চুপচাপ তো নই। খেলায় মনোযোগ দিচ্ছি।”

হ্যাপি বলল, “বাবা ভাবছে।”

আমরা দুজনেই চেষ্টা করছি আরাশকে বুঝতে না দিতে যে আমাদের মধ্যে সমস্যা আছে।

কিন্তু শিশুরা সবকিছু বোঝে। তাদের একটা স্বজ্ঞা আছে।

আরাশ বলল, “তোমরা কি রাগ করো?”

আমি বললাম, “না তো। কেন এমন মনে হচ্ছে?”

হ্যাপি বলল, “আমরা রাগ করি নাই।”

কিন্তু আমাদের গলার স্বর স্বাভাবিক নয়। আমাদের আচরণ স্বাভাবিক নয়।

আরাশ চুপ হয়ে গেল। কিন্তু তার চোখে একটা উদ্বেগ।

আমি বুঝলাম, আমরা আরাশকে একটা মানসিক চাপ দিচ্ছি। ও বুঝতে পারছে কিছু একটা ঠিক নেই, কিন্তু কী সেটা জানে না।

এই না-জানা তার জন্য কষ্টকর।

আমি চেষ্টা করলাম আরো স্বাভাবিক হতে। হ্যাপির সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম।

“হ্যাপি, তুমি কোন রঙ নেবে?”

“যেটা আছে।”

ছোট উত্তর। কিন্তু অন্তত কথা।

আরাশ একটু স্বস্তি পেল। কিন্তু আমি জানি, ও সব বুঝছে।

আমি ভাবলাম, আমরা কি ঠিক করছি? আমাদের ব্যক্তিগত সমস্যা আরাশের সামনে লুকানো কি ঠিক?

একদিকে, আমরা চাই না আরাশ আমাদের সমস্যায় জড়িয়ে পড়ুক। ও একটা শিশু। ওর খেলার বয়স।

অন্যদিকে, আমরা তাকে একটা মিথ্যার মধ্যে রাখছি। শেখাচ্ছি যে সমস্যা লুকানো যায়।

আমি জানি না কোনটা সঠিক।

খেলা শেষে আরাশ বলল, “বাবা, তোমরা বন্ধু হয়ে যাও।”

আমি চমকে গেলাম। আরাশ তাহলে সব বুঝেছে।

আমি বললাম, “আমরা তো বন্ধুই।”

আরাশ বলল, “তাহলে হাসো।”

আমি হাসলাম। হ্যাপিও হাসল। কিন্তু সেই হাসি জোর করে।

আরাশ বলল, “এখন ভালো লাগছে।”

কিন্তু আমি জানি, আরাশ স্বস্তি পায়নি। ও বুঝেছে আমরা ভান করছি।

রাতে আরাশ ঘুমানোর পর আমি হ্যাপিকে বললাম, “আমাদের এভাবে ভান করা উচিত নয়।”

হ্যাপি বলল, “তাহলে কী করব? আরাশের সামনে ঝগড়া করব?”

আমি বললাম, “না। কিন্তু এত অভিনয়ও ঠিক না।”

আমরা দুজনে মিলে ঠিক করলাম, আমাদের সমস্যা আরাশের সামনে নিয়ে আসব না। কিন্তু অভিনয়ও করব না।

পরদিন সকালে আমি হ্যাপির সাথে কথা বলে সমস্যা সমাধান করলাম। আরাশ যখন নাস্তা খেতে এল, আমরা স্বাভাবিক ছিলাম।

আরাশ বলল, “এখন তোমরা আসল বন্ধু।”

আমি বুঝলাম, শিশুরা মিথ্যা আর সত্যের পার্থক্য জানে। তাদের কাছে আসল হাসি আর নকল হাসির পার্থক্য স্পষ্ট।

আমাদের উচিত আরাশের সামনে আসল থাকা। সমস্যা লুকানো নয়, বরং সমস্যা সমাধান করা।

কারণ আরাশ যদি দেখে যে সমস্যা হলে লুকাতে হয়, ও নিজেও সেটাই শিখবে।

আর আমরা চাই আরাশ শিখুক সমস্যার সমাধান করতে। লুকাতে নয়।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *