“আপনার অর্ডার ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত।” এই মেসেজটা পেতেই আমার বুকের ভিতর যেন একটা বাচ্চা লাফালাফি শুরু করল। যে শার্টটা অর্ডার করেছি সাত দিন আগে, সেটা আজ আসছে।
সাত দিন ধরে আমি এই শার্টটার কথা ভেবেছি। কেমন লাগবে গায়ে? রং কি ঠিক সেরকম হবে যেমনটা ছবিতে দেখেছিলাম? সাইজ কি ফিট হবে? নাকি অন্যদের মতো আমারও হতাশ হতে হবে?
হ্যাপি বলল, “হায়দার, তুই তো এমন উত্তেজিত হয়ে আছিস যেন বিয়ের দাওয়াত এসেছে।” আমি হেসে বললাম, “একটা নতুন শার্ট আসছে।” কিন্তু ভিতরে ভিতরে জানি, এটা শুধু শার্টের ব্যাপার না।
আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, কী এসেছে?” আমি বললাম, “আসেনি এখনো, আসবে।” আরাশ বুঝল না কেন আসেনির জন্য এত খুশি হওয়া।
দরজায় বেল বাজতেই আমি দৌড়ে গেলাম। ডেলিভারি ছেলেটা একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট এগিয়ে দিল। “সাইন করুন।” আমি সাইন করলাম, কিন্তু চোখ ছিল প্যাকেটের উপর।
প্যাকেটটা হাতে নিতেই আমার মনে হল যেন একটা গুপ্তধন পেয়েছি। ভিতরে কী আছে জানি, কিন্তু তবু একটা রহস্যের অনুভূতি। খোলার আগ পর্যন্ত সবকিছুই সম্ভব।
হ্যাপি বলল, “খোল না, দেখি কেমন।” কিন্তু আমি ধীরে ধীরে প্যাকেটটা ছুঁয়ে দেখলাম। ভাবলাম এই মুহূর্তটাকে আরেকটু টেনে রাখি। কারণ খোলার পরেই হতাশা আসতে পারে।
শৈশবের কথা মনে পড়ে গেল। ঈদের দিন নতুন জামা পেতাম। কিন্তু সেটা পেয়ে যেতাম আগের দিনই। কোনো রহস্য ছিল না। আর এখন? এখন একটা প্যাকেট খোলাটা যেন একটা ইভেন্ট।
প্যাকেটের কোনা থেকে টেপ ছিঁড়তে শুরু করলাম। প্রতিটা টানে আমার হৃদস্পন্দন বাড়ছে। আরাশও এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। ওরও কৌতূহল জেগেছে।
প্লাস্টিকের প্যাকেট খুলে ভিতর থেকে আরেকটা প্যাকেট বেরিয়ে এল। এত প্যাকেজিং কেন? একটা শার্টের জন্য এত আবরণ? নাকি এই আবরণগুলোই আসল রোমাঞ্চ?
শেষ প্যাকেট খুলতেই শার্টটা বেরিয়ে এল। নীল রং, যেমনটা ছবিতে দেখেছিলাম। কাপড়ও ভালো মনে হচ্ছে। সাইজ দেখলাম – ঠিক আছে।
কিন্তু যেই মুহূর্তে শার্টটা হাতে নিলাম, সেই রোমাঞ্চটা যেন শেষ হয়ে গেল। রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে। এখন এটা আর একটা অজানা বস্তু নয়, একটা সাধারণ শার্ট।
গায়ে দিয়ে দেখলাম। ফিট পারফেক্ট। রংও সুন্দর। কিন্তু সেই আনন্দটা আর নেই যেটা প্যাকেট খোলার আগে ছিল।
হ্যাপি বলল, “কেমন হয়েছে?” আমি বললাম, “ভালো।” কিন্তু আসলে আমি একটু হতাশ। না, শার্টে সমস্যা নেই। সমস্যা আমার প্রত্যাশায়।
রাতে ভাবলাম – আমি কি প্রোডাক্টটার জন্য অর্ডার করেছিলাম, নাকি সেই অপেক্ষা আর রোমাঞ্চের জন্য? সেই স্বপ্ন দেখার জন্য যে হয়তো এই শার্টটা আমার জীবনটাই বদলে দেবে?
অনলাইন শপিং আসলে শুধু কেনাকাটা না। এটা একধরনের লটারি। পার্থক্য হল, এই লটারিতে আমি সবসময় কিছু না কিছু পাই। কিন্তু যেটা পাই সেটা সবসময় সেটা নয় যেটার স্বপ্ন দেখেছিলাম।
আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল – পরের দিনই আমি আবার অন্য কিছু অর্ডার করে দিলাম। আবার সেই একই রোমাঞ্চ। আবার সেই একই প্রত্যাশা।
এই চক্র কি কখনো শেষ হবে?
একটু ভাবনা রেখে যান