হলে বসেছি পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখতে। একটা পারিবারিক সিনেমা বলে দাবি। আরাশের পছন্দের হিরো। আমাদের সবার মতামত নিয়েই টিকিট কাটা। কিন্তু সিনেমা শুরু হওয়ার আধঘণ্টা পরই বুঝলাম আমরা একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পর্দায় হঠাত শুরু হল একটা রোমান্টিক দৃশ্য যেটা আমার সাথে বসে থাকা পরিবারের জন্য একদম উপযুক্ত নয়।
প্রথমেই আমার ঘাড় শক্ত হয়ে গেল। চোখ পর্দায় রেখেও মনোযোগ চলে গেল পরিবারের দিকে। আরাশ কী দেখছে? হ্যাপি কী ভাবছে? আমার শ্বশুর-শাশুড়ি যারা আমাদের সাথে এসেছেন, তারা কী মনে করছেন?
সিনেমার হিরো-হিরোইনের মধ্যে চুম্বনের দৃশ্য। আমি যেন ভুলে গেলাম কীভাবে স্বাভাবিক থাকতে হয়। চোখ পর্দায় রাখব নাকি অন্যদিকে তাকাব? দুটোই অস্বাভাবিক লাগছে।
আরাশের দিকে চোখের কোনায় তাকালাম। সে অবাক চোখে দেখছে। এই বয়সে এসব দৃশ্য তার জন্য নতুন। কিন্তু সে কি বুঝতে পারছে এগুলো কী? আমি কী করব? হঠাত করে তার চোখ ঢেকে দেব?
হ্যাপি অস্বস্তিতে পড়েছে। সে আমার দিকে একবার তাকাল, তারপর তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল। আমি বুঝলাম সেও একই অস্বস্তি অনুভব করছে।
সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে। তারা আমার থেকে বয়সে বড়। আমিই তাদের এই সিনেমায় নিয়ে এসেছি। তারা কী ভাবছেন আমার সম্পর্কে?
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “এই দৃশ্যটা যেন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়।” কিন্তু সিনেমার পরিচালক যেন আমার দুর্দশা বুঝতে পারছেন না। দৃশ্যটা আরো দীর্ঘ হতে থাকে।
মনে হল এই কয়েক মিনিট যেন কয়েক ঘণ্টার মতো দীর্ঘ। প্রতিটি সেকেন্ড যেন চলছে এক মিনিটের গতিতে। এমন লাগছে যেন পুরো হল আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
হঠাত মনে পড়ল ছোটবেলায় টিভিতে এমন দৃশ্য এলে বাবা চ্যানেল পরিবর্তন করে দিতেন। অথবা আমাদের বলতেন অন্য রুমে যেতে। কিন্তু সিনেমা হলে তো চ্যানেল পরিবর্তন করা যায় না।
আরাশ আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আব্বু, ওরা কী করছে?” এই প্রশ্নে আমি আরো বিপদে পড়লাম। কী উত্তর দেব? “পরে বলব” বলে এড়িয়ে গেলাম।
শাশুড়ি একবার আমার দিকে তাকালেন। তার মুখে একটা অভিযোগের ভাব। যেন বলতে চাইছেন, “এ কেমন সিনেমা নিয়ে এলেন?”
আমি ভাবলাম উঠে বাইরে চলে যাই। কিন্তু তাতে আরো সমস্যা। তাহলে সবাই বুঝে যাবে আমি অস্বস্তিতে পড়েছি।
অবশেষে দৃশ্যটা শেষ হল। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। কিন্তু মনে হল এটা প্রথম দৃশ্য মাত্র। সিনেমায় আরো এমন দৃশ্য আসতে পারে।
ইন্টারভালের সময় আমরা বাইরে গেলাম। কেউ কিছু বলল না। কিন্তু সবার মুখে একটা অস্বস্তির ছাপ।
হ্যাপি আমার কানে বলল, “পরবর্তী বার সিনেমার রিভিউ দেখে যাব।” আমি মাথা নাড়লাম।
দ্বিতীয় অংশে আরো সতর্ক হয়ে বসলাম। প্রতিটি দৃশ্যের জন্য প্রস্তুত। যেই কোনো রোমান্টিক দৃশ্য আসার আভাস পেলেই আরাশের দিকে তাকিয়ে তার মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতাম।
সিনেমা শেষে বাড়ি ফেরার পথে সবাই নীরব। আরাশ বলল, “সিনেমাটা ভালো ছিল।” কিন্তু সে কিছু প্রশ্নও করল যার উত্তর দেওয়া কঠিন।
বাড়িতে এসে ঠিক করলাম পরের বার সিনেমায় যাওয়ার আগে ভালোভাবে রিসার্চ করব। অন্তত এমন বিপদে আর পড়তে চাই না।
কিন্তু মনে হয় এটা আমাদের সংস্কৃতির একটা সমস্যা। সিনেমায় পারিবারিক কনটেন্ট বলে যেটা মার্কেটিং করা হয়, সেখানেও এমন দৃশ্য থাকে যা সত্যিকারের পারিবারিক নয়।
আজকাল আরাশের সাথে সিনেমা দেখতে যাওয়ার আগে অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিই। কারণ এই অস্বস্তির মুহূর্তগুলো এড়াতে চাই।
একটু ভাবনা রেখে যান