“ইন্টারনেট কেন এত স্লো?” আমি চিৎকার করে বললাম। ইউটিউবে একটা ভিডিও লোড হতে পাঁচ মিনিট লাগছে। অফিসের জরুরি একটা মেইল পাঠাতে পারছি না। এবং সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হল আমাদের বাড়ির সবচেয়ে গভীর তদন্ত কার্যক্রম।
হ্যাপি রান্নাঘর থেকে চিৎকার করে বলল, “আমি কিছু করিনি। আমি তো শুধু ফেসবুক দেখছিলাম।” যেন ফেসবুক দেখা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু আমি জানি ফেসবুকেও অনেক ডেটা খরচ হয়।
আরাশ তার ঘর থেকে চিৎকার করে বলল, “আমি গেম খেলছিলাম। কিন্তু অনলাইন গেম না। অফলাইন।” তার এই দাবি নিয়ে আমার সন্দেহ। আজকালকার সব গেমেই কোনো না কোনো অনলাইন ফিচার থাকে।
আমি গোয়েন্দা হয়ে গেলাম। প্রথমে রাউটার চেক করি। সব লাইট জ্বলছে। সিগন্যাল ভালো। তাহলে সমস্যা কী? কেউ কি বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করছে?
হ্যাপিকে জিজ্ঞেস করি, “তুমি কোনো সিরিয়াল ডাউনলোড করছিলে?” সে বলে, “না তো। শুধু একটা রেসিপির ভিডিও দেখছিলাম।” রেসিপির ভিডিও! এই ভিডিওগুলো HD কোয়ালিটিতে হয়। অনেক ডেটা খায়।
আরাশের কাছে গিয়ে তার ফোন চেক করি। দেখি তার ইউটিউব হিস্ট্রি ভর্তি। “তুমি তো সারাদিন ইউটিউব দেখেছ।” সে বলে, “শুধু একটু।” এই “একটু” মানে ছয় ঘন্টা!
আমাদের ঘরে তিনটা ফোন, একটা ল্যাপটপ, একটা টিভি – সব কিছুই ওয়াইফাইয়ে কানেক্টেড। প্রতিটা ডিভাইস কিছু না কিছু ডেটা ব্যবহার করে। এমনকি বন্ধ অবস্থায়ও।
সবচেয়ে বড় সন্দেহ পড়ে আরাশের উপর। “তুমি নিশ্চয়ই কোনো বড় গেম ডাউনলোড করেছ।” সে প্রাণপণ অস্বীকার করে। কিন্তু আমি তার ফোনে গিয়ে দেখি একটা ২ জিবির গেম ব্যাকগ্রাউন্ডে ডাউনলোড হচ্ছে।
“এটা কী?” সে বলে, “এটা অটোমেটিক আপডেট।” অটোমেটিক আপডেট! এই জিনিসটাই সব সমস্যার মূল। আমরা জানি না কখন কী আপডেট হচ্ছে।
হ্যাপিও দোষী সাব্যস্ত হয় যখন দেখি তার ফোনে ফেসবুকের ভিডিও অটো প্লে চালু আছে। প্রতিটা ভিডিও আপনা আপনি চালু হয়ে ডেটা খাচ্ছে।
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন এই ছোট্ট ঘরে এত সব ডিভাইস? আগে তো এক টিভিতেই সবাই খুশি ছিলাম।”
তদন্তের পরবর্তী ধাপ – প্রতিবেশীদের সন্দেহ করা। “পাশের বাড়ির কেউ নিশ্চয়ই আমাদের ওয়াইফাই ব্যবহার করছে।” পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করি। কিন্তু ইন্টারনেটের গতি একই থাকে।
সবশেষে ISP কোম্পানিকে ফোন করি। “আপনাদের সার্ভিস কেন এত স্লো?” তারা বলে, “স্যার, আপনার এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে।” লোডশেডিং! আমি জানতামই না।
কিন্তু এই তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে আমাদের পরিবারের একটা ভয়ানক সত্য উন্মোচন হয়। আমরা সবাই ইন্টারনেট আসক্ত। একটা মুহূর্ত ছাড়া থাকতে পারি না।
হ্যাপি যখন রান্না করে, তখনও ইউটিউবে রেসিপি দেখে। আরাশ যখন পড়তে বসে, তখনও ব্যাকগ্রাউন্ডে গান চালু থাকে। আমি যখন অফিসের কাজ করি, তখনও ফেসবুক নোটিফিকেশন চেক করি।
ইন্টারনেট স্লো হলে আমরা যেন অসহায় হয়ে পড়ি। কী করব বুঝতে পারি না। বই পড়ব? টিভি দেখব? একে অপরের সাথে গল্প করব? এসব কিছুই অস্বাভাবিক লাগে।
পরের দিন ইন্টারনেটের গতি ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের তদন্ত চলতেই থাকে। কে কতক্ষণ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে, সেটা নিয়ে হিসাব-নিকাশ।
এক সপ্তাহ পরে আবার একই সমস্যা। আবার সেই একই তদন্ত। আবার সবাই একে অপরকে দোষারোপ। যেন ইন্টারনেট স্লো হওয়া আমাদের পারিবারিক একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
হয়তো এটাই আধুনিক পরিবারের চিত্র। আমরা ইন্টারনেটের উপর এতটাই নির্ভরশীল যে এটা ছাড়া একদিনও কাটাতে পারি না। এবং এই নির্ভরশীলতা আমাদের মধ্যে একধরনের প্যারানোইয়া তৈরি করে।
কিন্তু এই তদন্তের মধ্যে একটা মজার ব্যাপার আছে। এটা আমাদের একসাথে এনে দেয়। সবাই মিলে একটা সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করি। যদিও সেই সমস্যা শুধুমাত্র ইন্টারনেটের গতি।
একটু ভাবনা রেখে যান