ব্লগ

একাকী সন্ধ্যার দর্শন

নভেম্বর ২০২৫ · 9 মিনিটে পড়া
শেয়ার

পার্কের বেঞ্চে বসা প্রশ্ন

পার্কে একা বসে থাকেন সত্তর বছরের এক বৃদ্ধ। প্রতিদিন আসেন — সকাল ন’টায়, যখন রোদ এখনো নরম, যখন কাকের ডাক থেমে গেছে কিন্তু শহরের কোলাহল পুরোপুরি জাগেনি। একই বেঞ্চে বসেন — পার্কের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, বটগাছের ছায়ায়, যেখান থেকে পুকুরটা দেখা যায়। একই ভঙ্গিতে বসেন — হাঁটুর ওপর দুই হাত রাখা, পিঠ সামান্য বাঁকানো, চোখ কোথাও অনির্দিষ্টে স্থির। আমি প্রতিদিন জগিং করতে গিয়ে তাঁকে দেখি। প্রথম প্রথম ভাবতাম শুধু আরেকজন বুড়ো মানুষ। কিন্তু এখন প্রশ্ন জাগে — এই মানুষটি কি জ্ঞানী হয়েছেন সত্তর বছরের যাত্রায়, নাকি শুধু একাকীত্বের সাথে তাল মিলিয়ে নিয়েছেন? এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য কী? আদৌ কি কোনো পার্থক্য আছে?

তাঁর চোখের দিকে তাকালে কী দেখি? গভীর প্রজ্ঞা — যা আসে সত্তর বছরের বেঁচে থাকা থেকে, হাজার ভুল আর শেখা থেকে, অসংখ্য হারানো আর পাওয়া থেকে? নাকি দেখি হারিয়ে ফেলার বেদনা — স্ত্রী হয়তো নেই আর, সন্তানরা হয়তো দূরে, বন্ধুরা হয়তো একে একে চলে গেছে সেই দেশে যেখান থেকে কেউ ফেরে না? প্রজ্ঞা আর বেদনা কি আলাদা কিছু? নাকি একই অভিজ্ঞতার দুটো নাম?

গতকাল সাহস করে এগিয়ে গেলাম। জগিং থামিয়ে তাঁর বেঞ্চের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। জিজ্ঞেস করলাম, “আঙ্কল, রোজ এখানে আসেন কেন? এত নিয়ম করে, এত একই সময়ে?” উনি আমার দিকে তাকালেন — সেই তাকানোয় বিরক্তি ছিল না, কৌতূহলও ছিল না, ছিল শুধু একটা স্থির গ্রহণ, যেন এই প্রশ্ন তিনি জানতেন আসবে। তারপর হাসলেন — সেই হাসি যা হাসে তারা যারা অনেক কিছু দেখে ফেলেছে। বললেন, “বাড়িতে আর কেউ নেই। স্ত্রী গেছে পাঁচ বছর আগে। ছেলে থাকে কানাডায়, মেয়ে সিঙ্গাপুরে। বাড়িতে শুধু দেয়াল আর আমি। এখানে অন্তত পাখিরা আছে। ওরা আমাকে চেনে। আমি এলেই কাছে আসে।”

পাখিদের সাথে সম্পর্ক — এটা কি প্রজ্ঞা নাকি অসহায়তা? একজন মানুষ যখন মানুষের অভাবে পাখিদের কাছে যায়, সেটা কি জীবনের গভীর সত্য বোঝা — যে সঙ্গ সবখানে পাওয়া যায়, শুধু চোখ খুলে দেখতে হয়? নাকি এটা শেষ আশ্রয় — যখন আর কিছু নেই, তখন যা আছে তাই আঁকড়ে ধরা? আমি উত্তর জানি না। হয়তো কেউ জানে না। হয়তো প্রশ্নটাই ভুল।

বাড়ি ফিরে সারারাত ভাবলাম। আমার বার্ধক্য কেমন হবে? সাঁইত্রিশ থেকে সত্তর — আরো তেত্রিশ বছর। এই তেত্রিশ বছরে পৃথিবী কতটা বদলে যাবে? আরাশ তখন কোথায় থাকবে? সে-ও কি উড়ে যাবে কানাডায়, অস্ট্রেলিয়ায়, কোনো সুদূর দেশে যেখানে সুযোগ বেশি, টাকা বেশি, ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল? হ্যাপি আমার পাশে থাকবে তো? নাকি জীবন এমন কোনো মোড় নেবে যা এখন কল্পনাও করতে পারছি না? আমিও কি একদিন একা বসে থাকব পার্কের বেঞ্চে, পাখিদের ডাকব, তাদের কাছে খুঁজব সেই সঙ্গ যা মানুষের কাছে পাইনি?

দাদুর কথা মনে পড়ে। জীবনের শেষ কয়েক বছর উনি খুব কম কথা বলতেন। সারাদিন বসে থাকতেন বারান্দায়, চোখ বন্ধ করে, কখনো কখনো ঠোঁট নড়ত যেন কারো সাথে কথা বলছেন — হয়তো নিজের সাথে, হয়তো স্মৃতির সাথে, হয়তো যারা চলে গেছে তাদের সাথে। আমরা তখন ছোট, ভাবতাম দাদু বুড়ো হয়ে গেছেন, মাথা ঠিক নেই, কথা বলার শক্তি নেই। কিন্তু এখন সাঁইত্রিশ বছর বয়সে মনে হয় — হয়তো দাদু বুঝে গিয়েছিলেন কথার অসারতা। হয়তো সত্তর বছর কথা বলার পর তিনি আবিষ্কার করেছিলেন যে বেশিরভাগ কথা অর্থহীন, বেশিরভাগ কথোপকথন সময়ের অপচয়। হয়তো তাঁর নীরবতা ছিল সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা — যা বলার নেই তা না বলা। কিন্তু আবার মনে হয় — এটাও তো হতে পারে যে তিনি কথা বলতে চাইতেন কিন্তু কেউ শুনত না, তিনি সংযোগ চাইতেন কিন্তু কেউ সময় দিত না। তাঁর নীরবতা তাহলে প্রজ্ঞা নয় — যোগাযোগের ব্যর্থতা, একাকীত্বের সাদা পতাকা।

আমার এক প্রতিবেশী আছেন — সুধীরকাকু। আশি বছর বয়স। একা থাকেন, ছেলেমেয়েরা আলাদা। প্রতিদিন সকালে বারান্দায় একটা চেয়ার পেতে বসেন, চা খান, আর রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম, “কাকু, এভাবে বসে কী দেখেন?” উনি চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, “দেখি মানুষ কত তাড়াতাড়ি চলে। সবাই দৌড়াচ্ছে — অফিসে, স্কুলে, বাজারে। কিন্তু জানি না কোথায় যায়। আমিও একদিন এভাবে দৌড়াতাম। এখন বসে দেখি আর ভাবি — এত দৌড়ে কী পেলাম?” এই পর্যবেক্ষণ কি জ্ঞান — যা আশি বছর বেঁচে থাকলে পাওয়া যায়? নাকি এটা বিচ্ছিন্নতার ফল — যে মানুষ আর দৌড়ে অংশ নিতে পারছে না, সে দূর থেকে দেখে আর সান্ত্বনা খোঁজে এই ভেবে যে দৌড়ের কোনো মানে নেই?

বৃদ্ধরা প্রায়ই বলেন, “আমাদের সময়ে এমন ছিল না।” — এই বাক্যটা কি অভিজ্ঞতার কথা, তুলনার কথা, শেখার কথা? নাকি এটা অতীতে আটকে থাকা, বর্তমানকে মেনে নিতে না পারা, পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে ব্যর্থতা? হয়তো দুটোই। হয়তো প্রতিটি “আমাদের সময়ে”-র মধ্যে একইসাথে আছে মূল্যবান অভিজ্ঞতা আর অচলায়তনের গন্ধ। এই দুটোকে আলাদা করা কঠিন — হয়তো অসম্ভব।

নানু মারা যাওয়ার আগে, শেষ কয়েক মাস, আমাকে কাছে ডেকে বলেছিলেন, “বয়স হলে বুঝবি, সবকিছুর একটা চক্র আছে। জন্ম, বেড়ে ওঠা, বুড়ো হওয়া, মরে যাওয়া — তারপর আবার জন্ম। তুই যা দেখছিস, আমি দেখেছি। তোর ছেলে যা দেখবে, তুইও দেখেছিস।” তখন আমি তরুণ, বুঝিনি কী বলছেন। মনে হয়েছিল বুড়োদের এলোমেলো কথা। এখনও পুরোপুরি বুঝি না। কিন্তু আরাশকে দেখে মাঝে মাঝে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয় — যেন আমি আমার শৈশবকে আবার দেখছি, যেন সময় একটা বৃত্ত, যেন আমরা সবাই একই গল্পের বিভিন্ন চরিত্র। এই চক্রাকার দৃষ্টিভঙ্গি কি প্রজ্ঞা — জীবনের গভীর সত্য বোঝা? নাকি এটাও একাকীত্বের সান্ত্বনা — যখন সামনে কিছু নেই, তখন পেছনে তাকিয়ে প্যাটার্ন খোঁজা?

বার্ধক্যে মানুষ বন্ধু হারায়। কেউ মারা যায়, কেউ অসুস্থ হয়ে ঘরে বন্দী হয়, কেউ স্মৃতি হারিয়ে চিনতেই পারে না। যারা বেঁচে থাকে, তাদের সাথেও দূরত্ব তৈরি হয় — শারীরিক দূরত্ব, মানসিক দূরত্ব, প্রজন্মের দূরত্ব। সত্তর বছরের মানুষের বন্ধু হয়তো দুজন-তিনজন — বাকি সবাই স্মৃতি। এই কমিয়ে আনা কি জীবনের সারবস্তু খুঁজে পাওয়া — বুঝতে পারা যে অনেক মানুষের দরকার নেই, গভীর কয়েকটি সম্পর্কই যথেষ্ট? নাকি এটা বিকল্প না থাকার ফলাফল — যখন বেশিরভাগ চলে গেছে, তখন যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা ছাড়া উপায় কী?

আমার অফিসে একজন সিনিয়র কলিগ আছেন — ষাট বছর বয়স, রিটায়ারমেন্টের দোরগোড়ায়। উনি সবসময় বলেন, “তোমরা বুঝবে না, আমরা অনেক কিছু দেখেছি।” কিন্তু লক্ষ্য করি, তাঁর কথাবার্তায় কোনো গভীর insight নেই — শুধু পুরনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি, “আমাদের সময়ে”-র জাবর কাটা। তাঁর কাছ থেকে নতুন কিছু শিখি না, শুধু পুরনো গল্প শুনি। তাহলে কি বয়সের সাথে প্রজ্ঞা আপনা-আপনি আসে না? প্রজ্ঞা কি আলাদা একটা সাধনা — যা কেউ করে, কেউ করে না? কেউ সত্তর বছর বেঁচে জ্ঞানী হয়, কেউ সত্তর বছর বেঁচে শুধু বুড়ো হয়?

পার্কের সেই বৃদ্ধটির কথায় ফিরে আসি। “বাড়িতে আর কেউ নেই। এখানে অন্তত পাখিরা আছে।” এই মেনে নেওয়া — এই acceptance — এটা কি প্রজ্ঞা? জীবন যা দিয়েছে তা গ্রহণ করা, যা নেই তার জন্য না কাঁদা? নাকি এটা পরাজয় — লড়াই ছেড়ে দেওয়া, আশা ত্যাগ করা, হাল ছেড়ে দেওয়া? হয়তো এই দুটোর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। হয়তো প্রজ্ঞা মানেই একধরনের পরাজয় মেনে নেওয়া — বোঝা যে সব যুদ্ধ জেতা যায় না, সব স্বপ্ন পূরণ হয় না, সব মানুষ থাকে না। আর একাকীত্বের সাথে শান্তি করা মানেই জীবনের সাথে শান্তি করা — বোঝা যে একা থাকাটাও একটা অবস্থা, ভয়ের কিছু নেই।

তাহলে বার্ধক্যের প্রজ্ঞা আর নিঃসঙ্গতার অভিযোজন — এই দুটো আলাদা কিছু নয়। একই অভিজ্ঞতার দুটো নাম। একই মুদ্রার দুই পিঠ। পার্কের বেঞ্চে বসা সেই বৃদ্ধ একইসাথে জ্ঞানী এবং একা, একইসাথে শান্ত এবং বিষণ্ণ। আর আমি? আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখছি আমার ভবিষ্যৎ — তেত্রিশ বছর পরের আমাকে। সেই আমিও হয়তো বসে থাকব কোনো বেঞ্চে, পাখিদের সাথে কথা বলব, আর কেউ এসে জিজ্ঞেস করলে বলব, “বাড়িতে আর কেউ নেই।”

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *