ব্লগ

পাতার ভেতরের জগৎ

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গতকাল সন্ধ্যায় পুরনো বইগুলো গুছাতে গিয়ে হাতে এলো সেই বইটা। “লালসালু” – সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। কভার ছেঁড়া, পাতা হলুদ হয়ে গেছে। কিন্তু হাতে নিয়েই মনে পড়ে গেল প্রথম পড়ার সেই অনুভূতি।

আমি খুলে বসলাম। প্রথম লাইন – “মধু বিক্রি করতে করতে এ অঞ্চলে এসেছিল মজিদ।” আর সাথে সাথে আমি চলে গেলাম অন্য এক জগতে।

হ্যাপি ডাকল, “খাবে?” আমি মাথা নাড়লাম। আরাশ এসে বলল, “বাবা, কী পড়ছো?” “একটা গল্প।” “আমাকে শোনাবে?” “তুমি বুঝবে না।” কিন্তু মনে মনে ভাবলাম—আমিও কি বুঝি? নাকি শুধু অনুভব করি?

বইয়ের পাতায় চোখ রাখতেই মজিদের জগৎ আমাকে গিলে ফেলল। আমি আর এই ঘরে নেই। আমি সেই গ্রামে। সেই মাজারে। মজিদের সাথে।

কিন্তু এটা কী? আমি কি মজিদ হয়ে গেছি? নাকি মজিদ আমার ভেতরে ঢুকে গেছে? এই যে বই পড়া—এটা কি পালিয়ে যাওয়া? নাকি নিজেকে খোঁজা?

আমি পড়তে থাকলাম। চারপাশের সব আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল। হ্যাপির রান্নার শব্দ, আরাশের খেলার আওয়াজ, রাস্তার যানবাহন—সব চুপ। আছে শুধু মজিদের গল্প। আর আমি।

কিন্তু এই “আমি” কে? যে বইটা পড়ছে, সে কি সেই হায়দার যার চাকরি নেই? যে টাকার চিন্তায় রাত জাগে? নাকি অন্য কোনো হায়দার? যে মজিদের গ্রামে ঘুরে বেড়ায়?

আমি যখন পড়ি, তখন আমার দুটো জীবন হয়। একটা এই ঘরে—হ্যাপি-আরাশের সাথে। আরেকটা বইয়ের পাতায়—লেখকের সাথে। কিন্তু কোনটা বেশি সত্যি?

মজিদের জটিল চরিত্র দেখে আমার নিজেকে চিনতে পারলাম। আমিও কি মাঝে মাঝে মজিদের মতো? বাইরে একরকম, ভেতরে আরেকরকম? মানুষকে দেখাই এক জিনিস, আসলে আছি অন্য জিনিস?

হ্যাপি এসে বলল, “রাত দশটা বেজে গেছে। খাওয়া খাবে?” আমি চমকে উঠলাম। মনে হল যেন ঘুম থেকে জেগেছি। আমি তো মনে করছিলাম এইমাত্র পড়া শুরু করেছি।

এই সময়টা কোথায় গেল? আমি কি তিন ঘণ্টা পড়েছি, নাকি তিন মিনিট? বইয়ের জগতে সময়ের কোনো মাপ নেই। সেখানে শুধু আছে গল্প। আর আমি সেই গল্পের অংশ।

“তুমি আলাদা লাগছো।” হ্যাপি বলল। “কেমন আলাদা?” “চোখে একটা অন্য ভাব।” আমি বুঝলাম। বই পড়ার পর আমার চোখে সেই জগতের ছাপ থেকে যায়। মজিদের জগৎ আমার চোখে লেগে আছে।

খেতে বসে ভাবলাম—আমি কেন বই পড়ি? শুধু সময় কাটানোর জন্য? নাকি অন্য কোনো কারণে? হয়তো আমি খুঁজি নিজেকে। অন্য চরিত্রের মধ্যে আমার নিজের টুকরোগুলো।

আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, বইয়ের গল্প কি সত্যি?” আমি বললাম, “কোনটা সত্যি?” “যেটা লেখা আছে।” “লেখা আছে মানেই সত্যি?” আরাশ ভেবে বলল, “না। কিন্তু তুমি যখন পড়ো, তখন সত্যি লাগে?”

আমি অবাক হলাম। আরাশ ঠিক বলেছে। বই পড়ার সময় সব মিথ্যা সত্যি হয়ে যায়। মজিদ কোনো কাগজের চরিত্র নয়—সে জীবন্ত। তার ব্যথা আমার ব্যথা। তার দ্বন্দ্ব আমার দ্বন্দ্ব।

রাতে শুয়ে আবার বইটা খুললাম। এবার একা। নিঃশব্দে। আরো গভীরে যাওয়ার জন্য।

যত পড়ছি, তত মনে হচ্ছে—লেখক শুধু গল্প লেখেননি। তিনি আমার মনের গোপন কথাগুলো লিখেছেন। যা আমি কাউকে বলতে পারি না, তা তিনি মজিদের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন।

এই যে বই—এটা কি আসলে একটা আয়না? যেখানে আমি নিজেকে দেখি? নাকি এটা একটা জানালা? যে দিয়ে আমি অন্য জগৎ দেখি?

মনে পড়ল ছোটবেলার কথা। যখন প্রথম বই পড়া শিখেছি। “আমার বই” পড়ে কী যে আনন্দ হতো। “রাম সীতা গীতা হাটে যায়।” এই সহজ বাক্যেও কেমন যেন জাদু ছিল।

এখনো সেই জাদু আছে। “মধু বিক্রি করতে করতে এ অঞ্চলে এসেছিল মজিদ।” এই একটা বাক্যেই সব সৃষ্টি হয়ে যায়। মজিদ, গ্রাম, মাজার, মানুষজন—সব জীবন্ত হয়ে ওঠে।

কিন্তু এই জাদুটা কোথা থেকে আসে? অক্ষর থেকে? শব্দ থেকে? নাকি আমার মনের কোনো গোপন জায়গা থেকে? হয়তো লেখক শুধু চাবি দেন। তালা খোলার চাবি। আর সেই তালা আমার মনেই ছিল।

চোখ বুজে ভাবলাম—যদি পৃথিবীতে বই না থাকতো? তাহলে আমি কীভাবে জানতাম যে অন্য মানুষেরাও আমার মতো ভাবে? কীভাবে বুঝতাম যে আমার অনুভূতিগুলো অদ্ভুত নয়?

বই আমাকে বোঝায়—আমি একা নই। হাজার বছর আগে, অন্য দেশে, অন্য ভাষায় কেউ আমার মতোই ভেবেছেন। অনুভব করেছেন। আর সেই অনুভূতি লিখে রেখে গেছেন।

আবার বইটা খুললাম। এবার অন্য একটা অধ্যায়। আবার সেই জগতে ডুবে গেলাম। এবার আরো গভীরে। যেখানে আমি আর লেখকের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আমরা একসাথে গল্প তৈরি করছি।

এই যে বইয়ের সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়া—এটা কি প্রেম? ভালোবাসা? নাকি এক ধরনের আধ্যাত্মিক মিলন? আমি আর লেখক মিলে একটা তৃতীয় চেতনা তৈরি করি। যা শুধু আমার না, শুধু তারও না।

হঠাৎ মনে হল—আমি যখন এই বই পড়ছি, তখন আর দশজনও হয়তো পড়ছে। আমরা সবাই কি একই সময়ে একই জগতে আছি? আমাদের মধ্যে কি কোনো অদৃশ্য সংযোগ তৈরি হয়?

রাত বারোটা বেজে গেল। কিন্তু আমি পড়তে থাকলাম। এই সুখটা ছাড়তে মন চায় না। এই জগতটা ছেড়ে বাস্তবে ফিরতে ইচ্ছে করে না।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই সুখ কি স্বার্থপর? আমি কি আমার পরিবার, দায়িত্ব ভুলে গিয়ে শুধু নিজের আনন্দে মগ্ন? নাকি এই পড়াটা আমাকে আরো ভালো মানুষ করে তুলছে?

হয়তো দুটোই সত্যি। আমি পালাচ্ছিও, আবার ফিরে আসছিও। বই আমাকে অন্য জগৎ দেখায়, আবার নিজের জগৎটাকেও নতুন করে বুঝতে শেখায়।

বইটা বন্ধ করে রাখলাম। কিন্তু মজিদের গল্প আমার মনে থেকে গেল। সারারাত হয়তো স্বপ্নে দেখবো সেই গ্রাম। সেই মাজার। সেই জটিল মানুষটাকে।

আর এটাই হয়তো প্রিয় বইয়ের সবচেয়ে বড় উপহার—এটা আমাদের ভেতরে থেকে যায়। আমাদের অংশ হয়ে যায়। আমরা যা ছিলাম, তার চেয়ে একটু বেশি হয়ে উঠি।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *