ফোনটা বেজে উঠল। হ্যাপি উঠে নিল। “হ্যালো মা।”
তারপর সেই চেনা নাটক শুরু হল।
হ্যাপির মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। সে “হ্যাঁ মা, ঠিক আছে মা, বুঝতে পারছি মা” বলে যেতে লাগল। আমি বুঝতে পারলাম, আবার কোনো সমস্যা এসেছে।
ফোন রাখার পর হ্যাপি বলল, “মার রক্তচাপ বেড়ে গেছে। ডাক্তার দেখাতে হবে।”
“কত টাকা লাগবে?”
“হাজার পাঁচেক।”
আমার মাথা ঘুরে গেল। এই মাসে আমার হাতে পাঁচ হাজার টাকা নেই।
“আপাতত কিছু ওষুধ খেতে বল। পরে দেখি।”
হ্যাপির চোখে যে আগুন জ্বলে উঠল, সেটা আমি আগেও দেখেছি।
“পরে মানে? মার রক্তচাপ ২০০ এর উপরে। আর তুমি বলছ পরে?”
“আমি বলছি না আমার টাকা নেই?”
“তোমার সবসময় টাকা নেই। আমার মা-বাবার জন্য কখনো টাকা থাকে না।”
এই কথাটা আমার বুকে তীরের মতো বিঁধল।
“হ্যাপি, আমি…”
“তুমি কী? তুমি একজন স্বামী যে তার শাশুড়ির চিকিৎসার টাকাও দিতে পার না।”
আমি চুপ হয়ে গেলাম। কারণ হ্যাপি মিথ্যা বলেনি। আমি সত্যিই পারি না।
কিন্তু হ্যাপি এটা বুঝতে চায় না যে আমি সবসময় অভাবের মধ্যে থাকি। তার বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার মতো আর্থিক অবস্থা আমার নেই।
আমার নিজের পরিবার—হ্যাপি আর আরাশ—তাদের নিয়েই আমি হিমশিম খাই। তার উপরে আরো দুজন মানুষের দায়িত্ব?
কিন্তু এই কথা হ্যাপিকে বলতে পারি না। কারণ তাহলে সে ভাববে আমি তার বাবা-মাকে বোঝা মনে করি।
আর আমি কি সত্যিই বোঝা মনে করি না?
এই প্রশ্নটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। আমার শাশুড়ি একজন ভালো মানুষ। আমার সাথে ভালো ব্যবহার করেন। কিন্তু মাঝে মাঝেই তাঁর কোনো সমস্যা হয়, আর সেই সমস্যার বোঝা এসে পড়ে আমার কাঁধে।
আমি কি স্বার্থপর? একজন স্বামী হিসেবে কি আমার উচিত হ্যাপির বাবা-মায়ের সব দায়িত্ব নেওয়া?
আমার বন্ধু জামিউল বলে, “বিয়ে মানে দুটো পরিবারের সাথে বিয়ে। তুমি যদি একটা পরিবার সামলাতে না পার, তাহলে বিয়ে করলে কেন?”
কিন্তু আমার বিয়ের সময় তো কেউ আমাকে বলেনি যে আমাকে চার জনের দায়িত্ব নিতে হবে।
শেষপর্যন্ত আমি আমার ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা ধার করে হ্যাপির মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলাম।
হ্যাপি খুশি হয়েছে। কিন্তু আমার মনে একটা ক্ষোভ রয়ে গেছে।
এই ক্ষোভটা কার বিরুদ্ধে? হ্যাপির বিরুদ্ধে? তার বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে? নাকি নিজের বিরুদ্ধে?
আমি জানি না।
আমি শুধু জানি, বিয়ে মানে শুধু দুজনের ভালোবাসা নয়। বিয়ে মানে একগুচ্ছ দায়িত্ব, যার শেষ নেই।
একটু ভাবনা রেখে যান