ব্লগ

পরিবারের সামনে ফোনের অস্বস্তি

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

ফোনে রিং। অফিসের সহকর্মীর কল। বসার ঘরে বসে আছি হ্যাপি ও আরাশের সাথে। ফোন রিসিভ করলাম, কিন্তু কথা বলতে গিয়ে অস্বস্তি হচ্ছে। যেন আমি একটা মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করছি। পরিবারের সবাই শ্রোতা।

“হ্যালো, জামিউর ভাই?” আমার কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক শোনাচ্ছে। স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি ভদ্র, একটু বেশি আনুষ্ঠানিক। যেন আমি নিজেই নই। কেন এমন হয়? কেন আমি পরিবারের সামনে স্বাভাবিক থাকতে পারি না?

হ্যাপি টিভি দেখছে, কিন্তু আমি বুঝি তার কান আমার কথায়। আরাশ বই পড়ছে, কিন্তু সেও কিছুটা মনোযোগ দিচ্ছে। এই অদৃশ্য দর্শকদের উপস্থিতিতে আমি স্বতঃস্ফূর্ত হতে পারি না।

জামিউর অফিসের একটা কাজ নিয়ে কথা বলছে। খুব সাধারণ কথা। কিন্তু আমি পরিবারের কাছে নিজেকে ‘পেশাদার’ মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে চাই। তাই কথাগুলো একটু জটিল করে বলি। একটু বেশি ইংরেজি মিশাই।

“ইয়েস, আই থিংক উই শুড ফাইনালাইজ দ্যাট প্রজেক্ট।” এই কথা বাংলায় বললেও চলত, কিন্তু পরিবারের সামনে ইংরেজি বলে মনে হয় বেশি ‘educated’ শোনাচ্ছে।

আরাশ আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। যেন সে বুঝে গেছে আমি কেন এমন কথা বলছি। হ্যাপি মাথা নাড়ে। তারা জানে আমার এই কৃত্রিমতা।

যখন বন্ধুদের সাথে ব্যক্তিগত কথা হয়, তখন আরো সমস্যা। সাইফুলের কল এসেছে। সে আমার পুরনো বন্ধু। আমাদের মধ্যে অনেক রসিকতা, অনেক স্মৃতি। কিন্তু পরিবারের সামনে সেসব কথা বলতে লজ্জা লাগে।

“হ্যাঁ ভাই, কেমন আছিস?” আমার স্বর একদম যান্ত্রিক। সাইফুল হয়তো বুঝে গেছে যে আমি পরিবারের সামনে আছি। তাই সেও একটু সাবধানী হয়ে কথা বলছে।

এই অস্বস্তির কারণ কী? আমি কি চাই না পরিবার আমার বাইরের জীবনের কথা জানুক? নাকি আমার ভিতরে একাধিক ব্যক্তিত্ব আছে – একটা ঘরের মানুষ, একটা বাইরের মানুষ?

কখনো কখনো ব্যক্তিগত কল আসে এমন সময় যখন পুরো পরিবার বসে আছে। তখন ভাবি, অন্য রুমে গিয়ে কথা বলব নাকি এখানেই বলব। অন্য রুমে গেলে মনে হবে আমি কিছু লুকাচ্ছি। এখানে বললে স্বাধীনতা থাকে না।

আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন আমি পরিবারের সামনে অন্যরকম হয়ে যাই? কেন স্বাভাবিক থাকতে পারি না?”

সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি হয় যখন মায়ের কল আসে। এখন মা নেই, কিন্তু আগে যখন ছিলেন, তখন তার কল আসলে হ্যাপির সামনে কথা বলতে অদ্ভুত লাগত। মা জিজ্ঞেস করতেন, “খাওয়াদাওয়া ঠিক হচ্ছে তো?” আমি বলতাম, “হ্যাঁ মা।” কিন্তু হ্যাপির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখতাম সে হাসছে।

কারণ হ্যাপি জানে আমার খাওয়াদাওয়ার আসল অবস্থা। মায়ের কাছে যতই বলি সব ঠিক, হ্যাপি জানে কোন দিন আমি ঠিকমতো খাইনি।

অফিসের বসের কল আসলে আরো সমস্যা। তখন আমি যেন একজন আলাদা মানুষ হয়ে যাই। খুব বিনয়ী, খুব অনুগত। “জি স্যার, অবশ্যই স্যার।” হ্যাপি ও আরাশ এই রূপ দেখে অবাক হয়।

একদিন আরাশ জিজ্ঞেস করেছিল, “আব্বু, আপনি ফোনে আলাদা মানুষ হয়ে যান কেন?” এই প্রশ্নে আমি ভেবেছিলাম। সত্যিই তো, কেন এমন হয়?

হয়তো আমরা সবাই এরকম। আমাদের বিভিন্ন সামাজিক ভূমিকা আছে। অফিসে এক রকম, বন্ধুদের সাথে এক রকম, পরিবারের সাথে আরেক রকম। কিন্তু সমস্যা হয় যখন এই ভূমিকাগুলো একসাথে হয়।

এখন চেষ্টা করি পরিবারের সামনে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকতে। কিন্তু তবুও মাঝে মাঝে ধরা পড়ে যাই। হ্যাপি বলে, “তুমি ফোনে কথা বলার সময় আলাদা মানুষ হয়ে যাও।”

হয়তো এটাই স্বাভাবিক। হয়তো সবারই একাধিক ব্যক্তিত্ব আছে। কিন্তু সেগুলো গোপন রাখার দরকার নেই। পরিবার তো আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ। তাদের সামনে আমার আসল রূপটাই প্রকাশ পাওয়া উচিত।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *