গভীর ঘুমে আছি। চারপাশে কোনো শব্দ নেই। হ্যাপির নাক ডাকার শব্দ, রাস্তার গাড়ির আওয়াজ, এমনকি দেয়াল ঘড়ির টিকটিক – কিছুই আমার কানে যাচ্ছে না। কিন্তু ফোনের রিং বাজার সাথে সাথেই চোখ খুলে যায়।
এটা কী এক অদ্ভুত ক্ষমতা! যেন আমার কানের ভিতর একটা বিশেষ অ্যান্টেনা আছে যেটা শুধু ফোনের রিং ক্যাচ করে। বজ্রপাতের শব্দেও ঘুম ভাঙে না, কিন্তু ফোনের প্রথম রিংয়েই লাফিয়ে উঠি।
রাত ২টায় ফোন বাজে। কে ফোন করছে এত রাতে? ঘুমের ঘোরে ফোনটা হাতে নিই। দেখি রং নাম্বার। কিন্তু ততক্ষণে আমি পুরোপুরি জেগে গেছি। আবার ঘুমাতে লাগে আরেক ঘন্টা।
এই ব্যাপারটা নিয়ে আরাশের সাথে আলোচনা করেছি। বলেছি, “আমি কিভাবে ঘুমের মধ্যেও ফোনের রিং শুনতে পাই?” সে বলেছে, “আব্বু, এটা কি সুপার পাওয়ার?” হয়তো সত্যিই একধরনের সুপার পাওয়ার।
কিন্তু এই পাওয়ারটা সব সময় কাজে আসে না। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কল মিস করি। কিন্তু রাত ২টায় কোনো ভুল নাম্বরের কলে জেগে যাই। যেন আমার মস্তিষ্ক ভুল প্রোগ্রাম হয়ে গেছে।
হ্যাপি বলে, “তুমি অন্য সব আওয়াজ শুনতে পাও না, কিন্তু ফোনের রিং শুনতে পাও।” সত্যি তো। ও যখন রাতে আমাকে ডাকে ঘুম ভাঙে না। কিন্তু ফোন বাজলে অমনি চোখ খুলে যায়।
এটা হয়তো আধুনিক যুগের একটা বিবর্তন। আমাদের পূর্বপুরুষেরা শিকারীর শব্দ শুনে জাগতেন। আমরা জাগি ফোনের রিং শুনে। যুগের সাথে সাথে আমাদের ইনস্টিংক্টও পাল্টে গেছে।
একবার ফোন সাইলেন্ট রেখে ঘুমিয়েছিলাম। কিন্তু ভাইব্রেশনের শব্দেও জেগে গিয়েছিলাম। যেন আমার শরীর ফোনের সাথে এক অদৃশ্য সংযোগ তৈরি করে রেখেছে।
গভীর রাতে যখন ফোনের রিং আমাকে জাগিয়ে দেয়, তখন মনে হয় এটা কোনো জরুরি খবর হবে। হয়তো কোনো আত্মীয়ের বিপদ। হয়তো অফিস থেকে জরুরি কোনো কাজ। কিন্তু ৯৯% সময়ে দেখি এটা রং নাম্বর।
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “এই যে আমার অদ্ভুত ক্ষমতা, এটা কি আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ?” কখনো মনে হয় আশীর্বাদ, কারণ জরুরি কল মিস করি না। কখনো মনে হয় অভিশাপ, কারণ অনর্থক জেগে থাকতে হয়।
অফিসে বসে এই নিয়ে চিন্তা করি। এত শব্দের মধ্যে কেন শুধু ফোনের রিং এত স্পেশাল? হয়তো এটা আমাদের মনের সাথে ফোনের যে গভীর সংযোগ তৈরি হয়েছে, তারই ফল।
ফোন বর্তমান যুগে আমাদের জীবনের একটা অপরিহার্য অংশ। হয়তো আমাদের অবচেতন মন ফোনকে এত গুরুত্ব দেয় যে ঘুমের মধ্যেও তার ডাকে সাড়া দিতে হয়।
সন্ধ্যায় ফোন বন্ধ করে রাখার কথা ভাবি। কিন্তু তাহলে যদি সত্যিকারের জরুরি কোনো ফোন আসে? আরাশের স্কুল থেকে? হ্যাপির অফিস থেকে? এই চিন্তাতেই ফোন বন্ধ করতে পারি না।
রাতে আবার সেই একই অভিজ্ঞতা। গভীর ঘুমে থাকি, কিন্তু ফোনের রিংয়ের সাথে সাথেই জেগে যাই। এই ক্ষমতাটা কি আমার একার, নাকি সবারই আছে?
হয়তো এটাই আমাদের যুগের বাস্তবতা। আমরা ফোনের গোলাম হয়ে গেছি এতটাই যে ঘুমের মধ্যেও তার নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হতে পারি না। কিন্তু এই গোলামি অনেক সময় কাজেও আসে।
সারাজীবন এই ক্ষমতা নিয়েই বাঁচতে হবে। ভালো-মন্দ মিলিয়ে। হয়তো একদিন এটা নিয়ে গর্বও করব – “আমি ঘুমের মধ্যেও ফোনের রিং শুনতে পাই।”
একটু ভাবনা রেখে যান