ফটোকপি
একটি কাল্পনিক গল্প
সকাল সাতটায় এলার্ম বাজলো।
ফয়সাল সাহেব চোখ খুললেন। সিলিংয়ের দিকে তাকালেন।
একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো — এই সকাল আগেও দেখেছেন। ঠিক এই আলো। ঠিক এই ছায়া। ঠিক এই মুহূর্ত।
গতকালও এমন ছিল। তার আগের দিনও। তার আগেও।
উঠলেন। বাথরুমে গেলেন।
টুথব্রাশ একই জায়গায়। পেস্ট একই জায়গায়। তোয়ালে একই হুকে।
আয়নায় নিজেকে দেখলেন।
একই মুখ। একই চোখের কালি। একই ক্লান্তি।
গতকালও এই মুখ দেখেছিলেন। একটুও বদলায়নি।
নাস্তার টেবিলে বসলেন।
স্ত্রী মুনিরা চা দিলেন। পরোটা দিলেন। ডিম ভাজি।
“অফিস কটায় যাবে?”
“আটটায়।”
এই কথোপকথন কতবার হয়েছে? হাজারবার? দশ হাজারবার?
ফয়সাল সাহেব গুনে দেখেছেন — এই অফিসে যোগ দিয়েছেন বাইশ বছর আগে। বাইশ বছর মানে প্রায় আট হাজার দিন।
আট হাজার দিন একই প্রশ্ন, একই উত্তর।
বাস স্টপে গেলেন।
একই মানুষগুলো দাঁড়িয়ে আছে।
লাল শার্টের লোকটা আজও আছে। গতকালও ছিল। গত বছরও ছিল।
নীল শাড়ির মহিলা আজও ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে। একই ব্যাগ। একই ভঙ্গি।
বাস এলো। একই বাস। একই নম্বর। একই রঙ।
ফয়সাল সাহেব জানালার পাশের সিটে বসলেন।
গতকালও এই সিটে বসেছিলেন।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন।
একই রাস্তা। একই দোকান। একই সাইনবোর্ড।
কিছুই বদলায়নি।
অফিসে পৌঁছালেন।
রিসেপশনিস্ট বললো, “গুড মর্নিং স্যার।”
“গুড মর্নিং।”
সিঁড়ি দিয়ে উঠলেন। একই সিঁড়ি। একই ধাপ। একই রেলিং।
ডেস্কে বসলেন।
কম্পিউটার খুললেন। পাসওয়ার্ড দিলেন। একই পাসওয়ার্ড গত পাঁচ বছর ধরে।
ইমেইল চেক করলেন। একই ধরনের ইমেইল। একই ধরনের কাজ।
সহকর্মী মাসুদ এলো।
“ফয়সাল ভাই, কেমন আছেন?”
“ভালো।”
“অফিস কেমন?”
“চলছে।”
এই কথোপকথন প্রতিদিন হয়। শব্দে শব্দে মিল।
দুপুরে ক্যান্টিনে গেলেন।
একই লাইন। একই কাউন্টার। একই মেনু।
“ভাত দেন।”
“মাছ নেবেন?”
“হ্যাঁ।”
এই সংলাপ কতবার বলেছেন?
বসলেন। খেলেন। উঠলেন।
গতকালও এই টেবিলে বসেছিলেন। একই চেয়ার। একই অবস্থান।
বিকেলে বাসায় ফিরলেন।
মুনিরা দরজা খুললেন।
“এসেছ? আজ কেমন গেল?”
“ভালো।”
এই প্রশ্ন-উত্তর বাইশ বছর ধরে চলছে।
কোনোদিন কি মুনিরা অন্য প্রশ্ন করবেন? কোনোদিন কি তিনি অন্য উত্তর দেবেন?
ছেলে তুহিন স্কুল থেকে ফিরেছে।
“পড়ালেখা কেমন?”
“ভালো।”
এই পরিবারে সবকিছু “ভালো।”
ফয়সাল সাহেব ভাবলেন — “ভালো” শব্দটা কি আসলেই কিছু বোঝায়? নাকি শুধু একটা শব্দ যা বলতে হয়?
সন্ধ্যায় টিভি খুললেন।
একই চ্যানেল। একই অনুষ্ঠান।
গতকালও এই অনুষ্ঠান দেখেছিলেন। আজও দেখছেন। আগামীকালও দেখবেন।
রাতে খেলেন। একই খাবার। একই টেবিলে। একই সময়ে।
বিছানায় গেলেন। একই দিকে কাত হলেন। একই বালিশে মাথা রাখলেন।
ঘুমিয়ে পড়লেন।
আর পরদিন সকাল সাতটায় আবার এলার্ম।
একদিন ফয়সাল সাহেব হিসাব করলেন।
তাঁর বয়স পঞ্চাশ। জন্মের পর প্রথম পাঁচ বছর মনে নেই। তারপর স্কুল — বারো বছর। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় — ছয় বছর। চাকরি — বাইশ বছর।
চাকরি জীবনের এই বাইশ বছরে কতগুলো “আলাদা” দিন ছিল?
ছুটির দিন? সেগুলোও একই রকম। ঘুমানো, টিভি দেখা, বাজারে যাওয়া।
ঈদের দিন? সেগুলোও একই। নামাজ, সেলামি, খাওয়া।
বেড়াতে যাওয়া? গত দশ বছরে একবারও যাননি।
তাহলে আট হাজার দিনের মধ্যে কতগুলো সত্যিই “আলাদা” ছিল?
হয়তো দশটা। হয়তো বিশটা।
বাকি সব ফটোকপি।
মুনিরা একদিন বললেন, “চলো কোথাও যাই।”
“কোথায়?”
“যেকোনো জায়গায়। কক্সবাজার। সুন্দরবন। যেখানে খুশি।”
ফয়সাল সাহেব ভাবলেন।
“পরে যাব।”
“কবে পরে?”
“দেখি।”
সেই “পরে” আর আসে না। কারণ “পরে” মানে রুটিন ভাঙা। আর রুটিন ভাঙার সাহস তাঁর নেই।
তুহিন একদিন বললো, “বাবা, আমরা কখনো কিছু অ্যাডভেঞ্চার করি না কেন?”
“অ্যাডভেঞ্চার মানে?”
“মানে… অন্যরকম কিছু।”
“কী অন্যরকম?”
তুহিন উত্তর দিতে পারলো না। কারণ সেও জানে না অন্যরকম কী।
এই পরিবার “অন্যরকম” ভুলে গেছে।
একরাতে ফয়সাল সাহেব স্বপ্ন দেখলেন।
তিনি একটা বিশাল ফটোকপি মেশিনের ভেতরে আছেন। মেশিন তাঁকে কপি করছে। একটার পর একটা কপি বের হচ্ছে।
প্রতিটা কপি একই রকম। একই মুখ। একই জামা। একই ভঙ্গি।
তিনি চিৎকার করলেন, “আমি অরিজিনাল কোথায়?”
কেউ উত্তর দিলো না।
ঘুম ভাঙলো।
পরদিন অফিসে গিয়ে বসের সাথে দেখা হলো।
বস বললেন, “ফয়সাল সাহেব, আপনি বাইশ বছর ধরে এখানে। আপনার মতো নির্ভরযোগ্য কর্মী কম।”
ফয়সাল সাহেব বুঝলেন — “নির্ভরযোগ্য” মানে “একই রকম।”
তিনি নির্ভরযোগ্য কারণ তিনি বদলান না। প্রতিদিন একই সময়ে আসেন। একই কাজ করেন। একই সময়ে যান।
মেশিনের মতো।
বাসায় ফিরে মুনিরাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি বোর হও না?”
“কীসে?”
“এই একই জীবনে।”
মুনিরা অবাক হলেন। “একই জীবন মানে?”
“প্রতিদিন একই রকম। কোনো পরিবর্তন নেই।”
মুনিরা কিছুক্ষণ ভাবলেন।
“আমি তো এটাকেই স্থিরতা মনে করি। পরিবর্তন মানেই কি ভালো?”
ফয়সাল সাহেব উত্তর দিতে পারলেন না।
সেই রাতে ঘুম এলো না।
ভাবলেন — স্থিরতা আর একঘেয়েমি কি এক?
কেউ বলে স্থিরতা ভালো। জীবনে শান্তি দরকার।
কেউ বলে একঘেয়েমি মৃত্যুর সমান। পরিবর্তন ছাড়া বেঁচে থাকা অর্থহীন।
কোনটা সত্য?
পরদিন অফিসে যাওয়ার পথে একটা কাজ করলেন।
অন্য রাস্তা দিয়ে হাঁটলেন।
একটু ঘুরপথ। কিন্তু নতুন দোকান দেখলেন। নতুন মানুষ দেখলেন। নতুন গাছ দেখলেন।
অফিসে পৌঁছাতে পাঁচ মিনিট বেশি লাগলো।
কিন্তু মনটা একটু হালকা লাগলো।
সেদিন দুপুরে ক্যান্টিনে অন্য টেবিলে বসলেন।
জানালার পাশে। আগে কখনো বসেননি।
বাইরে একটা গাছ দেখলেন। পাতা ঝরছে। সুন্দর।
আগে খেয়াল করেননি।
বাসায় ফিরে মুনিরাকে বললেন, “আগামী শুক্রবার কোথাও যাই।”
মুনিরা অবাক হলেন। “সত্যি?”
“হ্যাঁ। তুহিনকেও নিয়ে যাব।”
“কোথায়?”
“জানি না। বের হয়ে ঠিক করব।”
সেই রাতে বিছানায় শুয়ে ফয়সাল সাহেব ভাবলেন —
হয়তো সমস্যা রুটিনে নয়। সমস্যা রুটিনের বাইরে কিছু না থাকায়।
জীবনে কিছু দিন একই রকম হবে। সেটা স্বাভাবিক।
কিন্তু সব দিন একই রকম হলে জীবন হারিয়ে যায়।
মাঝে মাঝে একটা ভিন্ন রাস্তা। একটা ভিন্ন টেবিল। একটা ভিন্ন সিদ্ধান্ত।
এটুকুই যথেষ্ট।
পরদিন সকালে এলার্ম বাজলো।
ফয়সাল সাহেব চোখ খুললেন।
আজও সাতটা। আজও একই সিলিং।
কিন্তু আজ একটু আলাদা অনুভূতি।
আজ তিনি জানেন — এই দিনটাকে একটু আলাদা করার ক্ষমতা তাঁর আছে।
ছোট্ট একটা পরিবর্তন।
একটা ভিন্ন কাপে চা খাওয়া। একটা ভিন্ন রাস্তায় হাঁটা। একটা ভিন্ন গান শোনা।
এটুকুই।
ফটোকপি থেকে অরিজিনাল হতে বেশি কিছু লাগে না।
[এই গল্পের সকল চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।]
একটু ভাবনা রেখে যান