রফিক আজ নতুন কেবিনে বসেছে। বড় কেবিন। কাচের দেয়াল। নাম ফলকে লেখা “ডেপুটি ম্যানেজার”।
আমি আর রফিক একসাথে চাকরি শুরু করেছিলাম। একই দিন। একই সময়। একই পোস্ট। সে ডেপুটি ম্যানেজার, আমি এখনও সহকারী।
কী আছে তার যা আমার নেই?
রফিকের সাথে টিফিনে দেখা। সে খুশি। “ভাই, দোয়া করো। অনেক পরিশ্রম করেছি।”
পরিশ্রম? আমি কি পরিশ্রম করিনি? দশ বছর ধরে আগে আসি, পরে যাই। সব কাজ ঠিকমতো করি। তাহলে?
“অভিনন্দন।” বললাম। কিন্তু মুখে হাসি এলো না।
অফিসে ফিরে নিজের ডেস্কে বসলাম। ছোট ডেস্ক। পুরনো চেয়ার। চারদিকে শব্দ। মানুষের কথাবার্তা। টাইপ রাইটারের শব্দ।
রফিকের কেবিন থেকে শব্দ আসে না। একদম নিরব। শান্ত। সে নিশ্চয়ই ভাবছে বড় কিছু নিয়ে। পরিকল্পনা করছে।
আমি কী ভাবি? ভাবি ছুটির পর কেমন করে বাড়ি যাব। ভাবি হ্যাপি কী রান্না করেছে। ভাবি আরাশের স্কুলের বেতন কবে দেব।
বসের রুম থেকে রফিক বের হলো। হাসি মুখে। হাতে কাগজ। নিশ্চয়ই নতুন প্রজেক্ট। বড় প্রজেক্ট।
আমার টেবিলে কী আছে? পুরনো ফাইল। একই কাজ। দশ বছর ধরে একই কাজ।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে হ্যাপিকে বললাম, “রফিক প্রমোশন পেয়েছে।”
“ও! কেমন লাগছে তার?”
“ভালো লাগছে।”
মিথ্যা কথা। মোটেও ভালো লাগছে না। খারাপ লাগছে। ভীষণ খারাপ।
আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কবে প্রমোশন পাবে?”
কী উত্তর দেব? বলব জানি না? বলব হয়তো পাব না? বলব তোমার বাবা অযোগ্য?
“শীঘ্রই।” বললাম।
আরেকটা মিথ্যা।
রাতে ঘুমাতে পারলাম না। ভাবলাম আমার কী অভাব? পড়াশোনা? রফিকের চেয়ে আমার রেজাল্ট ভালো ছিল। অভিজ্ঞতা? একই অভিজ্ঞতা। দক্ষতা? আমার কাজে কোনো ভুল হয় না।
তাহলে কী? রফিক কি বসের সাথে বেশি কথা বলে? কি তার সাথে চা খায়? কি তার ছেলের বিয়েতে গিয়েছিল?
আমি এসব করি না। করতে পারি না। ভালো লাগে না। কিন্তু এগুলো কি দরকার? চাকরিতে উন্নতির জন্য এগুলো কি জরুরি?
তাহলে আমি ভুল পথে? আমি ভেবেছিলাম কাজ ভালো করলেই হবে। মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করলেই হবে। কিন্তু এটা কি যথেষ্ট নয়?
সকালে আবার অফিসে। রফিকের কেবিনে নতুন নাম ফলক। চকচকে। আমার ডেস্কে পুরনো নাম প্লেট। ম্লান।
আমি কি সারাজীবন এভাবেই থাকব? একই জায়গায়? একই পোস্টে?
নাকি আমার মধ্যে সত্যিই কিছু কম আছে?
একটু ভাবনা রেখে যান