বইমেলায় গেছি আরাশকে নিয়ে। ইসলামিক বইয়ের স্টলে দেখি “অলৌকিক ক্ষমতার আমল” নামে একটা বই। প্রচ্ছদে লেখা – “৭ দিনে ধনী হওয়ার দুআ”, “স্বামীর মন ফেরানোর তাবিজ”, “শত্রু ধ্বংসের আমল।”
আরাশ বই উল্টে দেখে বলে, “আব্বু, এটা কি সত্যি?” আমি বইটা নিয়ে পড়ি। দেখি লেখা – “সূরা ইয়াসিন ৪১ বার পড়ে ফুঁ দিলে যে কোনো রোগ সেরে যায়।”
আমি স্টলের মালিককে জিজ্ঞেস করি, “এই তথ্যের রেফারেন্স কোথায়?” তিনি বলেন, “সব কোরআন-হাদিস থেকে নেয়া।” আমি বলি, “কোন হাদিসে ৪১ বার পড়তে বলা হয়েছে?” তিনি বলেন, “বুজুর্গরা এভাবে করতেন।”
আমি ভাবি – বুজুর্গদের কাজ কি হাদিসের সমান?
বাড়ি ফিরে আরাশ বলে, “আব্বু, আমার ক্লাসমেট নাফিসের মা একটা বই থেকে পড়ে বলেছেন গর্ভবতী হলে তেলাওয়াত করলে ছেলে সন্তান হয়।” আমি জিজ্ঞেস করি, “কোন বই?” আরাশ বলে, “ইসলামিক আমল।”
আমি অনলাইনে সার্চ করি। দেখি এরকম শত শত বই। “রিজিক বৃদ্ধির গোপন দুআ”, “বিয়ে হওয়ার মোক্ষম আমল”, “চাকরি পাওয়ার নির্দিষ্ট সূরা।”
হ্যাপি বলে, “এগুলো যদি কাজ করে তাহলে ক্ষতি কী?” আমি বলি, “সমস্যা হলো – এগুলো যদি কোরআন-হাদিসে না থাকে, তাহলে আল্লাহর নাম দিয়ে মিথ্যা বলা হচ্ছে।”
আমি একটা বই কিনে ফেলি – “হাদিস শরিফে বর্ণিত ফজিলত।” বাড়িতে এসে গবেষণা করি। দেখি ১০০টা দুআর মধ্যে ৭০টাই মনগড়া। কোনো হাদিসের বই থেকে পাওয়া যায় না।
আমি প্রশ্ন করি নিজেকে – কেন কেউ আল্লাহর নাম দিয়ে মিথ্যা লেখে?
উত্তর সহজ – বেশি বিকায়।
আমি আমাদের এলাকার একজন আলেমের সাথে কথা বলি। তিনি বলেন, “হায়দার ভাই, এইসব বই পড়বেন না। নিজে কোরআন-হাদিস পড়েন।” আমি বলি, “কিন্তু সাধারণ মানুষ তো জানে না। তারা এগুলো পড়ে বিপদে পড়ে।”
তিনি বলেন, “সেটা তাদের সমস্যা।”
আমি হতাশ হই।
আরাশ একদিন বলে, “আব্বু, আমাদের ক্লাসে রিতা আপার বাচ্চা অসুস্থ। উনি একটা বই থেকে পড়ে তাবিজ বানিয়েছেন। বলছেন ডাক্তারের দরকার নেই।” আমি চমকে উঠি। বলি, “সেই বই কোনটা?” আরাশ বলে, “কোরআনিক চিকিৎসা।”
আমি সেই বইটা সংগ্রহ করি। দেখি লেখা – “ক্যান্সারের জন্য আয়াতুল কুরসি ৩৩৩ বার।” আমি ভাবি – ক্যান্সার রোগীর ডাক্তার লাগবে না, শুধু আয়াত পড়লেই সেরে যাবে?
এইটা কি ইসলাম, নাকি মানুষকে বোকা বানানো?
আমি ইউটিউবে দেখি এক হুজুর বলছেন, “ওষুধ খাবেন না। শুধু দুআ পড়েন।” তার পেছনে একটা বই রাখা – “প্রাকৃতিক ইসলামিক চিকিৎসা।”
আমি কমেন্ট পড়ি। একজন লিখেছেন, “আমার ছেলে ডায়াবেটিস। আপনার পরামর্শ মতো ইনসুলিন বন্ধ করে দিয়েছি। এখন খুব খারাপ।”
আমার গায়ে কাঁটা দেয়।
হ্যাপি বলে, “এইসব বইয়ের লেখকরা কি জানে না যে মিথ্যা লিখছে?” আমি বলি, “জানে। কিন্তু টাকার লোভে লেখে।”
আমি একটা বইয়ের লেখকের বায়োগ্রাফি পড়ি। দেখি তিনি কোনো মাদ্রাসায় পড়েননি, কোনো ইসলামিক স্কলার নন। কিন্তু ৫০টা ইসলামিক বই লিখেছেন।
আমি প্রশ্ন করি – যে ব্যক্তি ইসলাম জানেই না, সে কিভাবে ইসলামিক বই লিখে?
আরাশ বলে, “আব্বু, কোনো বই পড়লে আমি কিভাবে বুঝব সেটা সত্যি না মিথ্যা?” আমি বলি, “লেখকের যোগ্যতা দেখবে। রেফারেন্স চেক করবে। কোরআন-হাদিস থেকে ভেরিফাই করবে।”
আরাশ বলে, “কিন্তু সবাই তো আর আপনার মতো চেক করে না।”
আমি বলি, “সেইটাই সমস্যা।”
আমি একটা ফেসবুক পেজে পোস্ট করি – “এইসব মিথ্যা ইসলামিক বই সম্পর্কে সতর্ক থাকুন।” কিন্তু কমেন্টে মানুষ লিখে, “আপনি ইসলামের বিরুদ্ধে কেন?” “এগুলো তো ভালো কাজের বই।”
আমি ভাবি – মানুষ কি সত্য শুনতে চায় না?
রাতে স্বপ্ন দেখি। কেয়ামতের দিন। একজন বই লেখক দাঁড়িয়ে আছেন। আল্লাহ বলছেন, “তুমি আমার নামে মিথ্যা ছড়িয়েছো।” লেখক বলেন, “আমি তো মানুষের ভালো চেয়েছি।” আল্লাহ বলেন, “মিথ্যার মধ্যে কোনো ভালো নেই।”
সকালে ঘুম ভেঙে আয়নায় মুখ দেখি। প্রশ্ন করি – আমি কি এইসব ভুল বইয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবো? নাকি চুপ থাকবো?
এইসব মিথ্যা বই পড়ে যে মানুষগুলো বিপদে পড়ছে, তাদের দায় কার?
একটু ভাবনা রেখে যান