আমার মোবাইলে একটা ভিডিও এলো। “হজ্জ প্যাকেজ ২০২৫ – মাত্র ৮ লক্ষ টাকায়।” ভিডিওতে দেখি সাত তারকা হোটেল, এসি বাস, বুফে খাবার। কমেন্টে একজন লিখেছেন, “মাশাল্লাহ, এতো সুবিধা!”
আমি ক্যালকুলেটর বের করি। আট লক্ষ টাকা মানে আমার সাড়ে তিন বছরের সব খরচ। আমি যদি খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে শুধু হজ্জের জন্য টাকা জমাই, তবুও সাড়ে তিন বছর লাগবে।
হ্যাপি পাশে বসে বলে, “তোমার কী হজ্জের ইচ্ছে আছে?” আমি না বলতে পারি না, হ্যাঁ বলতে পারি না। ইচ্ছে আছে, সামর্থ্য নেই। আর সামর্থ্য থাকলেও – এই যে আট লক্ষ টাকা, এটা কি আসলে হজ্জের দাম, নাকি ভোগবিলাসের?
আরাশ বারান্দায় বসে জিজ্ঞেস করে, “আব্বু, হজ্জ মানে কী?” আমি বলি, “আল্লাহর ঘর দেখতে যাওয়া।” সে বলে, “তাহলে কেন এত টাকা লাগে? আল্লাহ কি টাকা নেন?”
আমার মুখ দিয়ে কোনো উত্তর বেরোয় না।
ফেসবুকে আরেকটা পোস্ট দেখি। “বিশেষ হজ্জ প্যাকেজ – মক্কা শরিফের একদম সামনে হোটেল। দাম ১৫ লক্ষ টাকা।” পোস্টে লাইক দিয়েছে ৫০০ জন। কমেন্টে লেখা – “ইনশাআল্লাহ বুক করবো।”
আমি গুগলে সার্চ করি – “হজ্জের আসল খরচ কত?” দেখি একটা আর্টিকেল। সৌদি সরকারের হিসাব অনুযায়ী একজন হাজীর প্রকৃত খরচ ৫০ হাজার টাকার মতো। বাকি সাড়ে সাত লক্ষ টাকা কোথায় যায়?
আমি ইউটিউবে “হজ্জ এজেন্সি” লিখে সার্চ করি। দেখি লাক্সারি গাড়িতে করে হজ্জ এজেন্টরা অফিসে আসছেন। তাদের অফিস কাঁচের তৈরি, মার্বেল পাথরের ফ্লোর। একটা ভিডিওতে দেখি একজন এজেন্ট বলছেন, “হজ্জ আমাদের জন্য খুব ভালো ব্যবসা। কারণ কাস্টমাররা প্রশ্ন করেন না।”
আমার পেটে মোচড় দেয়।
আমি একটা হাদিস পড়েছিলাম – “যার হজ্জ করার সামর্থ্য আছে কিন্তু সে হজ্জ করে না…” আমি ভাবি, সামর্থ্য মানে কী? আট লক্ষ টাকা দিয়ে একবার হজ্জ করা, নাকি আট লক্ষ টাকা দিয়ে ৮০ জন দরিদ্র মানুষের এক বছরের খাবার কেনা?
আমার মনে পড়ে নবীজির হজ্জের কথা। উট আর খেজুর। কোনো এসি, কোনো বুফে নয়। শুধু নিয়ত আর দুআ।
আমি হিসাব করি। আট লক্ষ টাকা দিয়ে আমি কত জন এতিমের লেখাপড়া চালিয়ে দিতে পারি? কতজন রোগীর চিকিৎসা করতে পারি? কতটা সৎকাজ করতে পারি?
কিন্তু সমাজ বলবে – হজ্জ না করলে ইমান অসম্পূর্ণ।
রাতে স্বপ্ন দেখি। আমি কাবা শরিফে দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশে মানুষের ভিড়। কেউ সোনার জুতা পরে তওয়াফ করছে, কেউ ডায়মন্ড বসানো তসবিহ হাতে নিয়ে দুআ করছে। আমি খালি পায়ে দাঁড়িয়ে দেখছি।
হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনি – “তুমি কেন এসেছো?”
আমি বলি, “আল্লাহকে দেখতে।”
আওয়াজ বলে, “আল্লাহ কি এই মার্বেল পাথরে আছেন?”
আমি বলি, “না, হৃদয়ে।”
“তাহলে আট লক্ষ টাকা দিয়ে কী কিনলে?”
আমি উত্তর দিতে পারি না।
সকালে ঘুম ভাঙ্গে। হ্যাপি বলে, “রাতে কী স্বপ্ন দেখেছিলে? কথা বলছিলে।”
আমি বলি, “হজ্জের স্বপ্ন।”
“কী রকম?”
আমি চুপ থাকি। কিভাবে বলবো – আমি স্বপ্নে দেখেছি যে হজ্জ হয়ে গেছে একটা ব্র্যান্ড? মক্কা শরিফ হয়ে গেছে একটা শপিং মল?
আরাশ এসে বলে, “আব্বু, আমাদের ক্লাসের রিয়ানের বাবা হজ্জ করে এসেছেন। তিনি বলছেন হজ্জের পর তার ব্যবসা অনেক বেড়েছে।”
আমি ভাবি – হজ্জ কি দুআ কবুলের মাধ্যম, নাকি ব্যবসার বরকতের?
আমার মনে হয় আমি একটা জটিল সমীকরণের মধ্যে আটকে আছি। একদিকে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা, অন্যদিক ব্যবসায়িক শোষণ। মাঝখানে আমি – যার হজ্জ করার ইচ্ছে আছে, কিন্তু এই ব্যবসার অংশ হওয়ার ইচ্ছে নেই।
আমি আয়নায় মুখ দেখি। প্রশ্ন করি – আল্লাহ, আমি কি হজ্জ করবো নাকি হজ্জ ব্যবসার শিকার হবো?
জবাব আসে না।
একটু ভাবনা রেখে যান