টিভিতে হজ্বের সম্প্রচার দেখছি। লক্ষ লক্ষ মানুষ সাদা কাপড় পরে কাবা ঘর তাওয়াফ করছে। একই পোশাক, একই দিকে মুখ, একই ইবাদত। কোনো ভেদাভেদ নেই। রাজা আর প্রজা একসাথে।
মনে মনে ভাবি, আমিও কি কখনো ওখানে যেতে পারব?
হ্যাপিকে বলি, “দেখো, কত সুন্দর দৃশ্য।”
হ্যাপি বলে, “হ্যাঁ। আমরাও একদিন যাব ইনশাআল্লাহ।”
“কবে?” আমি জিজ্ঞেস করি।
হ্যাপি চুপ থাকে। জানে টাকার অভাবে এই স্বপ্ন পূরণ হওয়া কঠিন।
হজ্বের খরচ খোঁজ নিয়েছি। সরকারি হজ্বে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বেসরকারিতে ৪ থেকে ৫ লাখ। আমার বেতন মাসে ৩৫ হাজার। সংসার চালাতেই শেষ হয়ে যায়। এই অবস্থায় হজ্বের টাকা জমাব কিভাবে?
হিসাব করে দেখি, যদি মাসে ৫ হাজার টাকা জমাই, তাহলে ৭০ মাস লাগবে। মানে ৬ বছর। কিন্তু মাসে ৫ হাজার জমানোটাই কঠিন।
আরাশ বলে, “বাবা, হজ্ব মানে কী?”
আমি বলি, “আল্লাহর ঘরে যাওয়া।”
“আমরা কবে যাব?”
“যখন আল্লাহ চাইবেন।”
আরাশ আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। কিন্তু তার চোখে প্রত্যাশা দেখি।
আমার মনে পড়ে, আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, “ওয়ালিল্লাহি আলান নাসি হিজ্জুল বাইতি মানিস্তাতাআ ইলাইহি সাবিলা।” মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য হজ্ব ফরজ, যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে।
“সামর্থ্য আছে” – এই শর্তে আমি পড়ি কিনা ভাবি। আমার কি সামর্থ্য আছে? নাকি নেই?
যদি জোর করে হজ্বের টাকা জমাই, তাহলে পরিবারের অভাব হবে। আরাশের পড়াশোনায় ব্যাঘাত হবে। হ্যাপির চিকিৎসায় কমতি হবে। এটা কি ঠিক?
নাকি আল্লাহর হুকুম পালনের জন্য সব কিছু ত্যাগ করতে হবে?
এই দ্বিধায় পড়ে যাই।
অফিসের রহিম ভাই গত বছর হজ্ব করেছেন। তিনি বলেছিলেন, “হজ্ব করার পর মনে হয় নতুন জন্ম হয়েছে। সব গুনাহ মাফ।”
আমার খুব ইচ্ছা করে সেই অনুভূতি পেতে। আমার গুনাহের বোঝা অনেক। হজ্ব করলে হয়তো হালকা হয়ে যেতাম।
কিন্তু রহিম ভাইয়ের বেতন আমার চেয়ে বেশি। তার বাবার সম্পত্তিও আছে। আমার কিছুই নেই।
মাঝে মাঝে ভাবি, আমি কেন এত গরিব? কেন আমার এত অভাব? অন্যরা হজ্ব করতে পারে, আমি কেন পারি না?
কিন্তু তারপর মনে পড়ে, এটা আল্লাহর পরীক্ষা। তিনি কাউকে দেন বেশি, কাউকে কম। আমি যা পেয়েছি, তাতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করি।
হ্যাপি একদিন বলেছিল, “আমরা যদি প্রতিদিন ২০ টাকা জমাই, তাহলে ১০ বছরে হজ্বের টাকা হয়ে যাবে।”
আমি হিসাব করে দেখেছি। ২০ টাকা গুণ ৩৬৫ দিন গুণ ১০ বছর = ৭২ হাজার টাকা। এটা দিয়ে হজ্ব হবে না।
কিন্তু হ্যাপির চেষ্টা দেখে ভালো লেগেছে।
আমি একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছি। নাম দিয়েছি “হজ্ব ফান্ড”। যখন পারি, ১০০-২০০ টাকা জমা দিই। এখন ৮ হাজার টাকা জমেছে।
এই হিসাবে হজ্ব করতে আরো ২০ বছর লাগবে। তখন আমার বয়স ৫৯। হজ্ব করার মতো শারীরিক সক্ষমতা থাকবে তো?
আল্লাহর কাছে দোয়া করি, “হে আল্লাহ, আমি আপনার ঘরে যেতে চাই। কিন্তু সামর্থ্য নেই। আপনি যদি চান, তাহলে পথ করে দিন।”
মাঝে মাঝে ভাবি, হয়তো আমার ভাগ্যে হজ্ব নেই। হয়তো আল্লাহ আমাকে অন্যভাবে পরীক্ষা করবেন।
কিন্তু আশা ছাড়তে পারি না। প্রতিদিন দোয়া করি। হজ্বের ছবি দেখে মনে মনে তাওয়াফ করি।
আরাশ বড় হবে। সে হয়তো একদিন আমাদের হজ্ব করিয়ে দেবে। বাবা-মায়ের হজ্ব করানো তো সন্তানের দায়িত্ব।
এই আশায় দিন কাটাই।
হজ্ব শুধু একটা যাত্রা নয়। এটা আল্লাহর ডাক। যার ভাগ্যে আছে, সে যাবে। নইলে ইচ্ছা থাকলেও পারবে না।
আমি শুধু দোয়া করতে পারি।
একটু ভাবনা রেখে যান