ব্লগ

আত্মীয়দের পড়ালেখার জিজ্ঞাসাবাদ

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

বিয়ে বাড়িতে গিয়েছি। আত্মীয়রা জড়ো হয়েছে। আরাশকে দেখে সবার প্রথম প্রশ্ন – “কী পড়ছ বাবা?” এই সাধারণ প্রশ্নটাই আমার কাছে একটা পরীক্ষা মনে হয়। যেন আরাশের উত্তরের উপর নির্ভর করবে আমি কেমন বাবা।

আরাশ বলে, “ক্লাস সিক্স।” আত্মীয়রা বলে, “ভালো। পড়ালেখা কেমন চলছে?” আরাশ বলে, “ভালো।” কিন্তু এই “ভালো” শব্দটা যথেষ্ট নয় আত্মীয়দের কাছে। তারা আরো জানতে চায়।

“কোন সাবজেক্টে ভালো?” “কোনটায় কম নম্বর পাও?” “ইংরেজিতে কেমন?” এক এক করে প্রশ্ন আসতে থাকে। আমি পাশে বসে চাপ অনুভব করি। যেন আমার সন্তানকে একটা ভাইভা বোর্ডে বসানো হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি হয় যখন আত্মীয়রা তাদের সন্তানদের সাথে তুলনা করে। “আমার ছেলে তো ক্লাস সিক্সে গোল্ডেন পেয়েছিল। তুমি কী পেয়েছ?” আরাশ একটু চুপ হয়ে যায়। আমার রাগ হয় কিন্তু কিছু বলতে পারি না।

এই প্রশ্নগুলোর পেছনে কী লুকিয়ে আছে? শুধু কি কৌতূহল? নাকি একটা মানদণ্ড নির্ধারণের চেষ্টা? আমার সন্তান কতটা “ভালো”, সেটা বিচার করার চেষ্টা?

আরাশ যখন বলে “গণিতে একটু কম নম্বর পাই”, তখন আত্মীয়দের চোখে একটা সন্তুষ্টির ভাব দেখি। যেন তারা একটা দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছে। তারপর শুরু হয় পরামর্শের বন্যা।

“গণিতের জন্য প্রাইভেট পড়ানো দরকার।” “আমাদের এলাকায় খুব ভালো একজন স্যার আছে।” “আজকালকার বাচ্চারা গণিতে দুর্বল।” এই পরামর্শগুলো আমার কানে খোঁচা মারে।

কখনো কখনো মনে হয় আত্মীয়রা আমার চেয়ে আরাশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি চিন্তিত। “এই বয়সে ভালো ফাউন্ডেশন তৈরি করতে হয়।” “এখন যদি সিরিয়াস না হয়, পরে সমস্যা হবে।”

আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “আমার সন্তানের পড়ালেখা নিয়ে এত মানুষ কেন মতামত দেয়? আমি কি যথেষ্ট দায়িত্বশীল বাবা নই?”

আরাশ একদিন বলেছিল, “আব্বু, আত্মীয়রা কেন আমাকে এত প্রশ্ন করে? স্কুলে তো এত প্রশ্ন হয় না।” তার এই নিষ্পাপ প্রশ্নে বুঝলাম যে সেও চাপ অনুভব করে।

সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা হয় যখন আত্মীয়রা আরাশের সামনেই তার দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করে। “ইংরেজিতে দুর্বল মানে ভবিষ্যতে সমস্যা।” “এখনকার যুগে ইংরেজি না জানলে চলবে না।”

এই কথাগুলো আরাশের আত্মবিশ্বাসে আঘাত করে। সে ভাবতে শুরু করে যে সে হয়তো যথেষ্ট ভালো না। আমি দেখি তার মুখে একটা হতাশার ছায়া।

বাড়ি ফিরে আরাশকে বোঝানোর চেষ্টা করি। “তুমি ভালো আছ। নিজের গতিতে এগিয়ে চল।” কিন্তু আত্মীয়দের কথার প্রভাব সহজে মুছে যায় না।

কখনো কখনো ভাবি, এই প্রশ্নগুলো করা বন্ধ করতে পারি না? কিন্তু তাহলে মনে হবে আমি অভদ্র। সামাজিক শিষ্টাচারের খাতিরে সহ্য করতে হয়।

হ্যাপি বলে, “তুমি চিন্তা করো না। আত্মীয়রা আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে।” কিন্তু আমি জানি এই আগ্রহের মধ্যে একটা বিচারের ভাব আছে।

পরের বার কোনো অনুষ্ঠানে গেলে আবার সেই একই প্রশ্ন। “কী পড়ছ?” এই প্রশ্নের জবাবে আরাশ যা-ই বলুক, আমি জানি পরের প্রশ্নগুলো আসবেই। এবং সেই প্রশ্নগুলো আমাদের দুজনকেই অস্বস্তিতে ফেলবে।

হয়তো এটাই আমাদের সমাজের বাস্তবতা। সন্তানের পড়ালেখা নিয়ে সবাই বিশেষজ্ঞ। সবার পরামর্শ, সবার মতামত। কিন্তু কে বুঝবে যে প্রতিটি সন্তানের নিজস্ব গতি আছে, নিজস্ব সামর্থ্য আছে?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *