ব্লগ

পর্দার নামে কারাগার

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ পাশের বাড়ির রহিম ভাইয়ের সাথে দেখা। গর্বের সাথে বলল, “হায়দার ভাই, আমার বউ পুরো পর্দানশীন। ঘর থেকে বের হয়ই না। এমনকি বাজার করতেও যায় না। আমিই সব কিনে আনি।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ভাবী অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে যায় কিভাবে?”

“মহিলা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। না পেলে ফোনে কথা বলে।”

“আপনি যদি কোনো কারণে না থাকেন?”

“আমার মা আছেন। কিন্তু এগুলো খুবই জরুরি পরিস্থিতিতে। নইলে বাড়িতেই থাকে।”

বাসায় ফিরে হ্যাপিকে বললাম। হ্যাপি বলল, “আমার মনে হয় এটা পর্দা না, এটা বন্দিত্ব।”

রাতে ইন্টারনেটে খোঁজ নিলাম পর্দার আসল বিধান। দেখলাম কুরআনে পর্দার (হিজাব) আয়াত অনেক সহজ ও ব্যবহারিক।

কুরআনে বলা হয়েছে (২৪:৩১), “মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশিত থাকে তা ছাড়া।”

“যা সাধারণত প্রকাশিত থাকে” – এই অংশের ব্যাখ্যায় সাহাবীদের মধ্যে মতভেদ আছে। ইবন আব্বাস (রা) বলেছেন এর অর্থ মুখমণ্ডল ও হাত। আইশা (রা) ও অন্যান্য সাহাবীদের থেকেও এমন বর্ণনা আছে।

রসুল (সা) এর যুগে নারীরা মসজিদে যেতেন, বাজারে যেতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে সেবা করতেন, কৃষিকাজ করতেন। আসমা বিনতে আবু বকর (রা) নিজের মাথায় খেজুরের বীচি বহন করে বাড়িতে নিয়ে আসতেন।

আইশা (রা) রসুল (সা) এর ওফাতের পর হজ্জ ও উমরা করেছেন। তিনি অসংখ্য পুরুষকে হাদিস ও ফিকহ শিখিয়েছেন।

তাহলে এই “ঘর থেকে না বেরোনো”র বিধান কোথা থেকে এলো?

কুরআনে একটি আয়াত আছে (৩৩:৩৩) যা বলে “তোমরা গৃহে অবস্থান করো।” কিন্তু এই আয়াত নাযিল হয়েছিল রসুল (সা) এর স্ত্রীদের সম্বোধন করে – “উম্মাহাতুল মুমিনীন” এর জন্য বিশেষ নির্দেশনা হিসেবে।

সাধারণ মুসলিম নারীদের জন্য এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা কুরআন-হাদিসে নেই।

আরাশ জিজ্ঞেস করল, “আব্বু, আম্মু কেন বাজারে যায়, অফিসে যায়?”

“কারণ ইসলামে নারীর ঘর থেকে বের হওয়ার অধিকার আছে প্রয়োজনে।”

“রহিম কাকির বউ কেন যায় না?”

“কাকা ভুল বুঝেছেন। উনি মনে করেন পর্দা মানে ঘরে আটকে রাখা। কিন্তু পর্দা মানে শালীনতা, বন্দিত্ব নয়।”

আমি ভাবি, রহিম ভাইয়ের বউয়ের কী অবস্থা? সে কি কখনো রোদ-বৃষ্টি দেখে? পার্কে হাঁটে? বন্ধুদের সাথে দেখা করে? নাকি চার দেয়ালের মধ্যে সারাজীবন?

এটা কি জীবন, নাকি জেল?

বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি হ্যাপি বাজার থেকে ফিরছে। কিছু পড়ার বই কিনেছে। তার মুখে হাসি। মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি যে আমি তাকে বন্দী করে রাখিনি।

আমার বিশ্বাস, আল্লাহ নারীকে সৃষ্টি করেছেন পুরুষের মতোই জ্ঞান অর্জনের, সমাজসেবার, পরিবার গড়ার জন্য। তাকে ঘরে আটকে রাখা আল্লাহর নেয়ামতের অপব্যবহার।

যারা পর্দার নাম করে নারীকে গৃহবন্দী করেন, তারা আসলে নিজেদের নিরাপত্তাহীনতা ও নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা ঢাকার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করেন।

কিন্তু সত্যিকারের ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে দায়িত্বশীল, স্বাধীন ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *