“ভিডিও কল চালু করুন?” – এই অপশনটা দেখতেই আমার হাতের তর্জনী যেন অবশ হয়ে গেল। জামিউর কল করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা। কিন্তু ভিডিও কল? এর মানে আমাকে দেখতে হবে নিজেকে।
“চালু করি?” – মনে মনে নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম। তারপর সাহস সঞ্চয় করে “Yes” চাপলাম। স্ক্রিনে আমার মুখটা ভেসে উঠতেই আমি চমকে পিছিয়ে গেলাম।
এটা আমি? এই যে ক্লান্ত, বয়সের ছাপ পড়া মুখটা, এটা সত্যিই আমার? আয়নায় তো এরকম লাগে না। আয়নায় আমাকে অন্যরকম লাগে।
জামিউর বলল, “হায়দার ভাই, শুনতে পাচ্ছেন?” আমি “হ্যাঁ” বললাম, কিন্তু আমার মনোযোগ তার কথায় নেই। আমি তাকিয়ে আছি নিজের দিকে। এই মানুষটা কি সত্যিই আমি?
চোখের নিচে কখন এত কালি পড়েছে? গালের এই ভাঁজগুলো কখন এসেছে? চুলে পাকের ছোপ এত বেশি ছিল? আমি কি অন্ধ হয়ে গেছিলাম নিজের প্রতি?
আরাশ পাশ দিয়ে গেল। স্ক্রিনে আমাকে দেখে বলল, “বাবা, তুমি কেমন যেন লাগছ।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কেমন?” আরাশ বলল, “জানি না, অন্যরকম।”
অন্যরকম। হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হচ্ছে। আমি কিসের অন্যরকম? আয়নার তুলনায়? নাকি আমার মনের ছবির তুলনায়?
জামিউর বলতে থাকল কাজের কথা। আমি মাঝে মাঝে “হুম”, “হ্যাঁ” বলছি। কিন্তু আসলে আমি অবজার্ভ করছি নিজেকে। আমি যখন কথা বলি, আমার মুখটা কেমন হয়? হাসি যখন হাসি, সেটা কি কৃত্রিম লাগে?
বুঝলাম, আমি নিজের মুখের সাথে পরিচিত নই। আয়নায় যে মুখটা দেখি, সেটা স্ট্যাটিক। আর এই ভিডিও কলে দেখছি ডায়নামিক। এখানে আমার প্রতিটা মুভমেন্ট, প্রতিটা এক্সপ্রেশন স্পষ্ট।
হঠাৎ লক্ষ করলাম, আমি বারবার নিজের চুল ঠিক করছি। নিজের শার্ট টেনে দিচ্ছি। যেন আমি এই ভার্চুয়াল আমাকে সাজিয়ে নিতে চাইছি।
জামিউর প্রশ্ন করল, “আপনার অডিও কি ঠিক আছে? মনে হচ্ছে একটু কম মনোযোগ দিচ্ছেন।” আমি লজ্জা পেলাম। সত্যি কথা বলতে পারলাম না যে আমি নিজের মুখ দেখে হতবাক হয়ে গেছি।
কল শেষ হতেই আমি আয়নার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। এই মুখটা আর ভিডিও কলের মুখটা কি আলাদা? আমার মনে হল, না। কিন্তু তাহলে কেন ভিডিও কলে আমাকে এত অচেনা লেগেছিল?
হ্যাপিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমাকে দেখতে কেমন লাগে?” হ্যাপি অবাক হয়ে বলল, “হায়দার, তোর কী হয়েছে? হঠাৎ এসব প্রশ্ন কেন?” আমি বললাম, “আজ ভিডিও কল করেছিলাম। নিজেকে অন্যরকম লাগল।”
হ্যাপি হেসে বলল, “আয়নায় তুই নিজেকে যেভাবে দেখিস, ক্যামেরায় সেভাবে আসে না। এটা স্বাভাবিক।” কিন্তু আমার কাছে স্বাভাবিক লাগল না।
রাতে শুয়ে ভাবলাম – আমার আসল পরিচয় কোনটা? আয়নার আমি, নাকি ক্যামেরার আমি? নাকি অন্য মানুষের চোখে যে আমি?
আমি বুঝলাম, প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি আসলে নিজেকে একটা নির্দিষ্ট অ্যাঙ্গেল থেকেই দেখি। একটা নির্দিষ্ট লাইটে, একটা নির্দিষ্ট এক্সপ্রেশনে। আর ভিডিও কল আমাকে দেখিয়ে দিল আমার অন্য সব দিক।
কিন্তু প্রশ্নটা হল – কোনটা সত্য আমি? নাকি সব কটাই সত্য, শুধু আমি একটা দিকেই অভ্যস্ত?
আগামীকাল জামিউর আবার ভিডিও কল করবে। এবার আমি প্রস্তুত থাকব। নিজেকে দেখে চমকে যাবো না।
কিন্তু সত্যি কথা হল, আমি কি কখনো নিজের সাথে পুরোপুরি পরিচিত হতে পারব?
একটু ভাবনা রেখে যান