বাবা মারা গেলেন।
হাসপাতাল থেকে ফিরে বাড়িতে ঢুকলাম। মা বসে আছেন। বোন কাঁদছে।
চাচা বললেন, “এখন তোমাকেই সব সামলাতে হবে।”
আমি বললাম, “সামলাব।”
সেই রাতে ছাদে গিয়ে বসেছিলাম। একা। আকাশে মেঘ। তারা নেই।
ভাবলাম, আমি কি সিদ্ধান্ত নিলাম সামলানোর? নাকি সামলানো ছাড়া আর কিছু করার ছিল না?
পরের বছরগুলোতে আমি বদলে গেলাম।
আগে দেরি করে উঠতাম। এখন সকাল ছয়টায় উঠি।
আগে টাকা নিয়ে ভাবতাম না। এখন প্রতিটা টাকা গুনি।
আগে হাসতাম বেশি। এখন কম।
সাইফুল একদিন বলল, “তুই বদলে গেছিস।”
“কীভাবে?”
“আগে তুই অন্যরকম ছিলি।”
“কোন রকম?”
সে ভাবল।
“হালকা।”
চুপ করে রইলাম।
হ্যাপির সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল বাবুর বিয়েতে।
সে জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনি কী করেন?”
আমি বলেছিলাম।
সে হেসেছিল।
পরে মা বলেছিলেন, “মেয়েটা ভালো। বিয়ে করে ফেল।”
খালা বলেছিলেন, “বয়স হয়ে যাচ্ছে। আর দেরি করো না।”
বন্ধুরা বলেছিল, “সংসার করলে মন ভালো থাকবে।”
আমি বিয়ে করলাম।
এখন ভাবি, আমি কি হ্যাপিকে বেছেছিলাম? নাকি সবাই মিলে ঠেলে দিয়েছিল?
একদিন হ্যাপিকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কেন আমাকে বিয়ে করলে?”
সে অবাক হয়ে তাকাল।
“কেন জিজ্ঞেস করছ?”
“এমনি।”
“তুমি ভালো মানুষ মনে হয়েছিল।”
“আর?”
“আর কী?”
“আর কিছু না?”
সে ভাবল।
“মা বলেছিল ছেলে ভালো। বাবা বলেছিল পরিবার ভালো।”
“তুমি কী বলেছিলে?”
“আমি বলেছিলাম ঠিক আছে।”
চুপ করে রইলাম।
“তুমি কেন এসব জিজ্ঞেস করছ?”
“জানি না।”
আরাশ জন্মানোর পর আমি আবার বদলে গেলাম।
আগে রাতে দেরি করে ঘুমাতাম। এখন তাড়াতাড়ি।
আগে নিজের কথা ভাবতাম। এখন তার কথা ভাবি।
আগে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতাম না। এখন সবসময় ভাবি।
সাইফুল বলল, “তুই আবার বদলে গেছিস।”
“কীভাবে?”
“এখন তুই বাবা বাবা লাগিস।”
“মানে?”
“মানে… সব কিছু আরাশকে নিয়ে।”
চুপ করে রইলাম।
আমি কি বদলেছি? নাকি আরাশ আমাকে বদলে দিয়েছে?
অফিসে বস বললেন, “এই প্রজেক্টটা তুমি নাও।”
“আচ্ছা।”
“পারবে?”
“পারব।”
বাড়ি ফিরে ভাবলাম, আমি কি প্রজেক্ট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম? নাকি বস বললেন, আমি রাজি হলাম?
সিদ্ধান্ত কোনটা? হ্যাঁ বলা? নাকি না বলতে না পারা?
জামিউরের সাথে চা খেতে বসলাম।
সে বলল, “তুই কি খুশি?”
“জানি না।”
“জানিস না?”
“না।”
সে হাসল।
“তুই আজকাল অদ্ভুত কথা বলিস।”
“বলি?”
“হ্যাঁ। আগে তো এসব বলতিস না।”
“আগে কী বলতাম?”
“সাধারণ কথা। ক্রিকেট, রাজনীতি, অফিস।”
“এখন?”
“এখন তুই… জানি না। অন্যরকম।”
বাড়ি ফিরে হ্যাপিকে বললাম, “আমি কি বদলে গেছি?”
“কবে থেকে?”
“জানি না। আগের থেকে।”
“সবাই বদলায়।”
“কিন্তু আমি কি নিজে বদলেছি? নাকি জীবন আমাকে বদলে দিয়েছে?”
সে আমার দিকে তাকাল।
“পার্থক্য কী?”
চুপ করে রইলাম।
“তুমি এত কঠিন প্রশ্ন করো কেন?”
“জানি না।”
আরাশ একদিন জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি সবসময় এরকম ছিলে?”
“কোন রকম?”
“এই রকম। চুপচাপ। ভাবনায়।”
“না।”
“তাহলে কেমন ছিলে?”
ভাবলাম।
“জানি না। মনে নেই।”
“মনে নেই?”
“না।”
সে একটু ভাবল।
“মানুষ কি নিজেকে ভুলে যায়?”
“হয়তো।”
সেই রাতে পুরনো ছবি দেখলাম।
কলেজের ছবি। বন্ধুদের সাথে। হাসছি। জোরে।
এই ছেলেটা কে?
আমি?
নাকি অন্য কেউ যে আমার জায়গায় ছিল?
পরদিন মাকে ফোন করলাম।
“মা, আমি কি বদলে গেছি?”
“কেন বলছিস?”
“এমনি।”
“সবাই বদলায়।”
“কিন্তু আমি কি নিজে বদলেছি?”
মা চুপ করে রইলেন।
“তোর বাবা মারা যাওয়ার পর তুই বদলে গেছিস।”
“কীভাবে?”
“গম্ভীর হয়ে গেছিস। দায়িত্ব নিয়ে গেছিস।”
“আমি কি চেয়েছিলাম?”
“চাওয়ার কিছু ছিল না। করতে হয়েছে।”
ফোন রেখে বসে রইলাম।
করতে হয়েছে।
এই তিনটা শব্দ।
আমার জীবনের কতটা “করতে হয়েছে”? আর কতটা “করতে চেয়েছি”?
পরদিন অফিসে যাওয়ার সময় রিকশায় বসে ভাবলাম।
আমি এই অফিসে কেন যাচ্ছি? চাকরি দরকার। টাকা দরকার। সংসার চালাতে হবে।
আমি কি চাকরি বেছেছিলাম? নাকি চাকরি আমাকে বেছেছিল?
রিকশাওয়ালা বলল, “ভাই, এইখানে নামবেন?”
“হ্যাঁ।”
নামলাম। অফিসে ঢুকলাম।
সারাদিন কাজ করলাম।
এই কাজগুলো কি আমার পছন্দ? নাকি পছন্দ করার সুযোগ ছিল না?
সেই রাতে আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি বড় হয়ে এটাই হতে চেয়েছিলে?”
“কী হতে?”
“যা তুমি এখন।”
চুপ করে রইলাম।
“বাবা?”
“জানি না।”
“জানো না?”
“না।”
সে একটু ভাবল।
“আমি বড় হয়ে পাইলট হতে চাই।”
“হও।”
“তুমি কি আমাকে হতে দেবে?”
তার দিকে তাকালাম।
“দেব।”
সে চলে গেল।
আমি ভাবলাম, আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করেছিল আমি কী হতে চাই?
মনে পড়ল না।
পরদিন সকালে আয়নায় তাকালাম।
শেভ করছি।
ভাবলাম, এই মুখটা কে বানিয়েছে?
আমি? নাকি জীবন?
বাবার মৃত্যু? বিয়ে? সন্তান? চাকরি?
নাকি সবকিছু মিলে?
ব্লেড চালাচ্ছি। ফোম সরছে। মুখ বেরোচ্ছে।
কার মুখ—জানি না।
হ্যাপি ডাকল, “নাস্তা তৈরি।”
“আসছি।”
ব্লেড রাখলাম। মুখ ধুলাম। বাইরে এলাম।
আরাশ টেবিলে বসে আছে। হ্যাপি চা ঢালছে।
বসলাম।
এই জীবনটা কি আমি বেছেছি?
নাকি এটাই ছিল?
জানি না।
রুটি তুললাম। খেতে শুরু করলাম।
একটু ভাবনা রেখে যান