ব্লগ

ক্রমাগত পরিচয় হারিয়ে ফেলার ভয়ঙ্কর প্রক্রিয়া

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে হঠাৎ করে ভাবলাম, আমি কে? হায়দার। কিন্তু এই হায়দার মানে কী? এই নামটা কী শুধু একটা শব্দ নাকি এর পেছনে কোনো মানুষ আছে?

প্রতিদিন আমি একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছি। সকালে যে মানুষটা ঘুম থেকে উঠেছিল, রাতে যে মানুষটা ঘুমাতে যাচ্ছে – এরা কি একই মানুষ?

অফিসে আমার একটা নাম। বাড়িতে আরেকটা নাম। রাস্তায় আরেকটা। প্রতিটা জায়গায় আমি একটা আলাদা মানুষ হয়ে যাই। কিন্তু আসল হায়দার কোনটা?

চাকরি যখন হারাই, তখন মনে হয় আমি আর সেই মানুষ নেই যে অফিসে যেত। নতুন চাকরি যখন পাই, তখন মনে হয় আমি একজন নতুন মানুষ। তাহলে পুরনো হায়দার কোথায় গেল?

হ্যাপি বলে, “তুমি আগের মতো নেই।” কিন্তু আগের মতো মানে কী? কোন আগের কথা বলছে সে? যখন আমরা প্রথম বিয়ে করেছিলাম? নাকি যখন আরাশ জন্মেছিল? নাকি যখন আমার বাবা মারা গিয়েছিলেন?

প্রতিটা ঘটনার পর আমি একটু বদলে গেছি। প্রতিটা কষ্টের পর একটুকরো পরিচয় হারিয়েছি। প্রতিটা আঘাতের পর আরেকটু অচেনা হয়ে গেছি নিজের কাছে।

আরাশ যখন ছোট ছিল, আমি ছিলাম তার সুপারহিরো আব্বু। এখন আমি কী? একজন ক্লান্ত মানুষ যে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু সংসারের চিন্তা করে।

আমার যৌবনের স্বপ্নগুলো কোথায় গেল? আমি তো একসময় কবি হতে চেয়েছিলাম। গান শিখতে চেয়েছিলাম। এখন আমি কী? একটা জীবন্ত যন্ত্র যে শুধু কাজ করে আর ঘুমায়।

সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো, এই পরিবর্তন এত ধীরে ধীরে হয়েছে যে আমি বুঝতেই পারিনি। একদিনে তো আমি হায়দার ছিলাম, পরদিন অন্য কেউ হয়ে যাইনি। প্রতিদিন একটুখানি করে পরিচয় মুছে গেছে।

আয়নায় নিজেকে দেখি, আর ভাবি এই চেহারাটা কার? এই চোখ দুটো কার? এই হাত দুটো কার? মনে হয় অন্য কারো শরীরে আমি বন্দী হয়ে আছি।

মাঝে মাঝে পুরনো ছবি দেখি। সেই হায়দারটা কে ছিল? কী ভাবতো? কীসে খুশি হতো? কীসে কষ্ট পেতো? আমি কি তাকে চিনি?

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আর ভাবি আল্লাহ কি আমাকে চিনতে পারেন? আমি যখন নামাজ পড়ি, তখন কে নামাজ পড়ে? হায়দার নাকি এই অচেনা মানুষটা?

সবচেয়ে বিচিত্র ব্যাপার হলো, মাঝে মাঝে আমি আমার আগের কোনো পরিচয়ের খোঁজ পাই। কোনো পুরনো গান শুনলে, কোনো পুরনো জায়গায় গেলে, কোনো পুরনো বন্ধুর সাথে কথা বললে। তখন মনে হয় যেন আমি আমার হারানো টুকরো খুঁজে পেয়েছি।

কিন্তু সেই অনুভূতি বেশিক্ষণ থাকে না। আবার হারিয়ে যায়। আবার আমি সেই অচেনা মানুষ হয়ে যাই।

হ্যাপি বলে, “তুমি কেন এত গুরুগম্ভীর হয়ে গেছ?” আমি বলি, “কখন গুরুগম্ভীর হয়েছি?” কিন্তু সত্যি তো। আমি কখন এত গুরুগম্ভীর হলাম? আগে তো আমি হাসতাম।

আরাশের সাথে খেলতাম। হ্যাপির সাথে গল্প করতাম। এখন কেন সব কিছুতে ভারী লাগে?

এই পরিবর্তন কি শুধু বয়সের কারণে? নাকি জীবনের চাপে? নাকি আমি নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে?

মাঝে মাঝে ভাবি, আমি যদি আমার ছোটবেলার নিজের সাথে দেখা করতে পারতাম, সে আমাকে চিনতে পারতো? নাকি সে বলতো, “তুমি কে? আমি তো এমন হওয়ার কথা ভাবিনি।”

আমার ছোটবেলার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে একজন ভালো মানুষ হব। এখন আমি কি ভালো মানুষ? নাকি শুধু একজন বেঁচে থাকা মানুষ?

সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, এই হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া থামছে না। প্রতিদিন আমি আরও কিছুটা হারিয়ে যাচ্ছি। একদিন হয়তো সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে যাব নিজের কাছে।

আল্লাহ, আমি কি আমার নিজেকে ফিরে পাব? নাকি এই হারিয়ে যাওয়াই জীবনের নিয়ম? মানুষ কি জন্মায় একজন হয়ে, আর মরে যায় অন্যজন হয়ে?

আর যদি সত্যিই তাই হয়, তাহলে আমার আসল পরিচয় কোনটা? যে ছিলাম, যে আছি, নাকি যে হব?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *