ব্লগ

পথ হারানোর গৌরব

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“Turn right after 100 meters” – গুগল ম্যাপের গলাটা শুনেই আমার ভিতরে একটা বিদ্রোহ জেগে উঠল। আমি সোজা চলতে থাকলাম।

হ্যাপি বলল, “হায়দার, ও তো ডানে যেতে বলল।” আমি বললাম, “আমি এই পথটা জানি। সোজা গেলেই পৌঁছে যাবো।”

কিন্তু আসলে কি জানি? এই এলাকায় আমি গত বছর একবার এসেছি। তখন অন্য পথে এসেছিলাম। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি এখানকার প্রতিটা গলিপথ চিনি।

“Recalculating route” – ফোনটা আবার বলল। আমি ভলিউম কমিয়ে দিলাম। এই রোবোটিক গলাটা আমাকে বলবে আমি কোথায় যাব? আমার নিজের বুদ্ধি নেই?

আরাশ পিছন থেকে বলল, “বাবা, আমরা কি হারিয়ে গেছি?” আমি বললাম, “না রে, পথ খুঁজে নিচ্ছি।” কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা অস্বস্তি কাজ করছে।

মনে পড়ে গেল, আমার বাবা কখনো কারো কাছে পথ জিজ্ঞেস করতেন না। হারিয়ে গেলেও নিজেই পথ খুঁজে বের করতেন। আমি সেই রক্তের উত্তরাধিকার।

২০ মিনিট ঘোরার পর বুঝলাম আমি সত্যিই হারিয়ে গেছি। কিন্তু তবু গুগল ম্যাপ চালু করলাম না। ভাবলাম, আরো খোঁজ করি।

হ্যাপি রাগ করে বলল, “হায়দার, গুগল ম্যাপ চালু কর।” আমি বললাম, “চালু আছে তো।” সত্যি কথা হল, আমার অহংকারে লাগছিল। একটা অ্যাপ আমার চেয়ে ভালো পথ জানবে?

আধঘন্টা পর একই জায়গায় তৃতীয়বার এসে পৌঁছলাম। এবার আরাশ বলল, “বাবা, আমার বাথরুম করতে হবে।” আমি বুঝলাম, আর পারা যাবে না।

অনিচ্ছায় গুগল ম্যাপের গাইড অন করলাম। “Turn left in 200 meters” – গলাটা শুনে আমার মনে হল যেন পরাজয়ের স্বাদ নিচ্ছি।

৫ মিনিটেই গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। পথটা এত সহজ ছিল। আমি যে রাস্তায় ঘুরছিলাম, তার ঠিক পাশেই ছিল আসল পথ।

হ্যাপি বলল, “দেখলে তো? শুরুতেই গুগল ম্যাপ শুনলে এত কষ্ট হত না।” আমি চুপ করে রইলাম। কী বলব? যে আমার অহংকার আমাদের আধঘন্টা ভোগান্তিতে ফেলেছে?

রাতে শুয়ে ভাবলাম – আমি কেন গুগল ম্যাপের কথা শুনতে চাইনি? কারণ আমার মনে হয়েছিল এটা আমার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। আমার নিজের বুদ্ধিমত্তাকে প্রশ্ন করছে।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কী হয়েছিল? আমি নিজের জেদের কাছে পরাজিত হয়েছিলাম। প্রযুক্তির কাছে নয়, নিজের অহংকারের কাছে।

আমি বুঝলাম, মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু তার নিজের অহংকার। গুগল ম্যাপ আমার শত্রু না, আমার অহংকার আমার শত্রু।

কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই গেল – সব পথ যদি গুগল ম্যাপ দেখিয়ে দেয়, তাহলে আমার নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা কি একদিন হারিয়ে যাবে না?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *