জীবন

প্রেম

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“তুমি আমাকে প্রেমে ফেলেছ।”

এই কথাটা শুনলেই মনে হয় আমি একটা অপরাধের শিকার। যেন প্রেম একটা ফাঁদ। একটা গর্ত।

কিন্তু কে ঠেলেছে? আমি নিজেই কি লাফ দিয়েছিলাম?

জানি না।


গত সপ্তাহে বন্ধু সামিরের সাথে তর্ক হয়েছিল। সে বলছিল, “প্রেম করাতে হয়। পরিকল্পনা করতে হয়।”

আমি শুনছিলাম। কিন্তু মনে হচ্ছিল সে একটা বিদেশী ভাষায় কথা বলছে।

পরিকল্পনা? প্রেমে পরিকল্পনা?

রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবলাম — আমি কখন প্রেমে পড়েছিলাম?

মনে করতে পারি না। একটা নির্দিষ্ট মুহূর্ত মনে করতে পারি না।

মনে পড়ে শুধু একদিন সকালে উঠে দেখি আমি প্রেমে আছি। ঠিক যেমন একদিন সকালে উঠে দেখি জ্বর হয়েছে।

কখন হল জানি না। কীভাবে হল জানি না।

কিন্তু হয়ে গেছে।


আমি প্রেমে পড়েছিলাম কলেজের লাইব্রেরিতে। সে বই পড়ছিল। আমি হাঁটছিলাম। চোখাচোখি হয়েছিল।

সেই মুহূর্তে কিছু একটা ঘটেছিল।

কিন্তু কী ঘটেছিল? বলতে পারব না।

শুধু জানি একটা পরিবর্তন হয়েছিল। তারপর থেকে সবকিছু আলাদা।

তারপর শুরু হয়েছিল — আমি তার পছন্দের বই পড়তাম। তার পছন্দের গান শুনতাম। তার পথে হাঁটতাম।

কিন্তু এটা কি পরিকল্পনা ছিল? নাকি প্রেমের প্রকাশ?

জানি না। দুটোর মধ্যে পার্থক্য কী সেটাও জানি না।


আজ আরাশকে দেখি। দশ বছরের ছেলে। সে বলল তার ক্লাসে একটা মেয়ে আছে। সুহানা। তার জন্য সে চকলেট নিয়ে যায়।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”

সে বলল, “জানি না। ভালো লাগে।”

এই “জানি না” শুনে হঠাৎ মনে হল — হয়তো এটাই।

আমরা জানি না কেন প্রেম করি। কীভাবে করি। কখন শুরু করি।

কিন্তু করি।


আমার স্ত্রীর সাথে এখন পনেরো বছরের বিয়ে। সেই চকলেট, সেই ফুল — সব শেষ।

তাহলে কি প্রেম শেষ?

গত মাসে আমি অসুস্থ ছিলাম। সে সারাদিন পাশে ছিল। কোনো কথা ছিল না। কোনো নাটক ছিল না।

শুধু যত্ন। নীরব যত্ন।

সেদিন ভাবছিলাম — এটা কি প্রেম? নাকি অন্য কিছু?


আমার এক সহকর্মী বলেছিল, “আমি আমার বউকে ভালোবাসি না। কিন্তু ভালো স্বামী হওয়ার চেষ্টা করি।”

এটা শুনে ভয় লেগেছিল। কারণ আমি নিজেও মাঝে মাঝে ভাবি — আমি কি এখনো প্রেমে আছি?

স্ত্রীকে দেখি প্রতিদিন। তার মুখ চিনি। তার অভ্যাস জানি। কিন্তু তাকে কি অনুভব করি?

নাকি সে একটা পরিচিত জিনিসে পরিণত হয়েছে? যেটা দেখতে ভালো লাগে, কিন্তু বিশেষ কিছু মনে হয় না।

এই চিন্তা করতে ভয় হয়।


রাতে ঘুমাতে পারি না। প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরতে থাকে।

স্ত্রী পাশে ঘুমাচ্ছে। তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনি। নিয়মিত।

হঠাৎ মনে হয় — এই শব্দ না থাকলে আমি ঘুমাতে পারতাম না।

এটা কি প্রেম? নাকি অভ্যাস?

দুটোর মধ্যে পার্থক্য কী?


সামির বলেছিল প্রেম মানে পরিকল্পনা। কিন্তু আমি মনে করতে পারি না কবে আমি পরিকল্পনা করেছিলাম।

একদিন আমি প্রেমে ছিলাম না। পরদিন ছিলাম। মাঝে কী হয়েছিল জানি না।

ঠিক যেমন একদিন আমি বেঁচে ছিলাম না। পরদিন ছিলাম। কিন্তু জন্মের মুহূর্তটা তো মনে নেই।


স্ত্রীকে দেখি। তার মুখের দিকে তাকাই। চেনা মুখ। অচেনা মুখ।

তাকে কি আমি চিনি? নাকি আমি যাকে চিনি বলে ভাবছি সে একটা ধারণা মাত্র?

আমরা পনেরো বছর একসাথে আছি। কিন্তু আমরা কি একসাথে?

নাকি আমরা দুটো আলাদা মানুষ, যারা একই ঘরে থাকে? একই বিছানায় ঘুমায়? কিন্তু আলাদা স্বপ্ন দেখে?


মনে পড়ে বাবার কথা। বাবা একবার বলেছিলেন, “প্রেম মানে একসাথে থাকা।”

আমি তখন মাথা নেড়েছিলাম।

কিন্তু এখন জানি — বাবা যা বলতে চেয়েছিলেন, তা বলতে পারেননি।

একসাথে থাকা মানে শুধু একই ছাদের নিচে থাকা নয়।

কিন্তু তাহলে কী?


রাতে আবার জেগে আছি। স্ত্রী ঘুমাচ্ছে। তার নিঃশ্বাসের শব্দ চলছে।

আমি এই শব্দ শুনি প্রতিরাত। পনেরো বছর ধরে।

কখনো খেয়াল করিনি। আজ খেয়াল করলাম।

এই শব্দ কি প্রেম? এই শব্দের অভাব কল্পনা করলে বুকটা কেঁপে ওঠে — এটা কি প্রেম?

জানি না।


সকালে উঠব। স্ত্রীকে দেখব। হাসব। কথা বলব।

ভান করব যে আমি জানি প্রেম কী।

কিন্তু এই রাতে, এই অন্ধকারে, আমি স্বীকার করি — আমি জানি না।

হয়তো কেউ জানে না।

হয়তো প্রেম একটা প্রশ্ন। যার উত্তর হয় না। শুধু প্রশ্ন থাকে।

আর সেই প্রশ্নের মধ্যেই আমরা বাঁচি।


ঘড়িতে সাড়ে তিনটা বাজে। আরও তিন ঘণ্টা পর সকাল হবে।

সকাল হলে আবার সবকিছু স্বাভাবিক লাগবে। আবার মনে হবে আমি বুঝি।

কিন্তু বুঝি না।

স্ত্রী নড়ে উঠল। চোখ খুলল। আমার দিকে তাকাল।

“ঘুম আসছে না?” সে জিজ্ঞেস করল।

“না।”

“কী ভাবছো?”

আমি কিছু বললাম না। কী বলব?

সে আবার চোখ বন্ধ করল। আমার হাত ধরল। নিজের দিকে টানল।

আমি শুয়ে পড়লাম। তার হাত আমার হাতে।

উষ্ণ। নরম।

এটা কি প্রেম?

জানি না।

কিন্তু হাত ছাড়িনি।

অস্তিত্ব একাকিত্ব নস্টালজিয়া প্রশ্ন ভালোবাসা

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

জীবন

শার্ট

অক্টোবর ২০২৫ · 12 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *