প্রেমে পড়লে শব্দ বেড়ে যায়। “তুমি,” “আমি,” “আমরা”—এই তিনটে সর্বনাম দিয়ে পুরো জগৎ বানানো যায়। “তোমার চোখে আকাশ,” “তোমার হাসিতে সূর্য,” “তোমার কণ্ঠে বৃষ্টি”—সাধারণ জিনিসগুলো হয়ে ওঠে কাব্যিক।
কিন্তু বিরহে শব্দ কমে যায়।
স্ত্রীর সাথে প্রথম দেখায় কত কথা! সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ফোন। কী বলতাম? মনে নেই। কিন্তু বলতাম। হাজারো শব্দে একটা প্রেম প্রকাশ করতাম।
এখন পনেরো বছর পর? খাবারের টেবিলে বসি নীরবে। প্রয়োজনীয় কথা বলি। “নুন দাও,” “পানি আনো।” প্রেম কমেনি। কিন্তু প্রেমের ভাষা হারিয়ে গেছে।
প্রেম কি শব্দের ওপর নির্ভরশীল?
বিয়ের আগে চিঠি লিখতাম। “তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।” এখন মেসেজ করি—”বাজার থেকে আসছি।”
প্রেমের ভাষা কি ক্ষণস্থায়ী?
মা মারা যাওয়ার পর বাবাকে দেখতাম। একা বসে থাকতেন। মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে। কিছু বলতেন না। কিন্তু তার নীরবতায় এমন প্রেম যে শব্দে প্রকাশ করা অসম্ভব।
গভীর প্রেম কি নীরবতায় বেশি স্পষ্ট?
প্রেমের শুরুতে বলার আগ্রহ। শেষে বোঝার নীরবতা।
আরাশ যখন ছোট ছিল, সারাক্ষণ “বাবা বাবা” করত। এখন বড় হয়েছে। কথা কম। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন হাতটা রাখে আমার কাঁধে, সেই স্পর্শে সব ভালোবাসা।
প্রেম পরিপক্ক হলে কম কথায় বেশি বলে।
বন্ধু সাইফুলের স্ত্রী মারা গেছে। তার সাথে দেখা করতে গেলাম। কী বলব? “দুঃখিত?” “সাহস রাখো?” সব কথাই ছোট লাগল। শেষে চুপ করে পাশে বসলাম। হাত রাখলাম কাঁধে। সে কাঁদল। আমিও চুপ।
বিয়োগের ভাষা নীরবতা।
কিন্তু এই নীরবতাও একরকম ভাষা। এই নীরবতায় সান্ত্বনা আছে। উপস্থিতি আছে। ভালোবাসা আছে।
প্রেমের ভাষা তিনটে স্তর। প্রথমে—উচ্ছ্বাসের শব্দ। তারপর—অভ্যাসের কথা। শেষে—গভীরতার নীরবতা।
স্ত্রী অসুস্থ হলে তার মাথায় হাত রাখি। কিছু বলি না। কিন্তু সেই হাতের স্পর্শে সব যত্ন, সব ভালোবাসা।
প্রেম কি শব্দ থেকে স্পর্শে চলে আসে?
মাঝে মাঝে ভাবি—আমি কি স্ত্রীকে এখনো ভালোবাসি? পুরনো উদ্দীপনা নেই। কিন্তু যখন সে দেরি করে বাড়ি ফেরে, অস্থির হয়ে যাই। এটাও কি প্রেম নয়?
প্রেমের ভাষা বয়সের সাথে বদলায়।
তরুণ প্রেম বাগ্মী। পরিণত প্রেম নীরব। কোনটা বেশি সত্য?
হয়তো দুটোই প্রেম। ভিন্ন মাত্রায়। ভিন্ন ভাষায়।
প্রেমের অভিধানে প্রথমে থাকে হাজারো শব্দ। শেষে থাকে একটি নীরবতা।
কিন্তু সেই নীরবতা সব শব্দের চেয়ে সত্য।
একটু ভাবনা রেখে যান